

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুরের দুটি সংসদীয় আসনেই জয় পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা, যা জেলাটির রাজনৈতিক মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলাটিতে এমন ফল শুধু নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ নয়, বরং সাংগঠনিক শক্তিমত্তা, ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হিসাব অনুযায়ী, মেহেরপুর-১ আসনে ভোট পড়েছে ৭৪.৩৯ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা তাজ উদ্দিন খান ১ লাখ ২৩ হাজার ২৭১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মাসুদ অরুণ পান ১ লাখ ৫ হাজার ৪৪১ ভোট। ব্যবধান দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৮৩০। মেহেরপুর-২ আসনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬৯.৯৩ শতাংশ। এখানে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের নাজমুল হুদা ৯৬ হাজার ৩০৬ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরাজিত বিএনপি প্রার্থী আমজাদ হোসেন পান ৮৫ হাজার ৯৮৮ ভোট। ব্যবধান ১০ হাজার ৩১৮।
নির্বাচনোত্তর আলোচনায় যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে, তা হলো বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন। প্রার্থী ও জেলা কমিটির মধ্যে দূরত্ব, নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস নির্বাচনী মাঠে দলটিকে দুর্বল করে তোলে বলে স্থানীয় ভোটার ও রাজনীতিবিদদের অভিমত। বিশেষ করে নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি, প্রচারণায় সমন্বয়ের অভাব এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতি না থাকাকে অনেক ভোটার দলটির প্রতি অনাস্থার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ধারাবাহিক প্রচারের মাধ্যমে শুরু থেকেই সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে। দলটির নারী কর্মীরা একাধিকবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যা সামাজিকভাবে রক্ষণশীল এলাকাগুলোতে জনমত পক্ষে টানতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। তাদের এই প্রচেষ্টা শুধু দলীয় সমর্থকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং দল-মত নির্বিশেষে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল হিসেবে কাজ করেছে।
ভোটব্যাংকের অপ্রত্যাশিত স্থানান্তর: মেহেরপুরে বিএনপির পরাজয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে আলোচনায় এসেছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক আচরণ। স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব ভোট সাধারণত বিএনপির দিকে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলোর বড় একটি অংশ ভিন্ন রাজনৈতিক অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে। মূলত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে হামলা, মামলা, দখল ও আইনি হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগ জনমনে অসন্তোষ তৈরি করে, যা ভোটের গোপন প্রবণতায় প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনের পর বিএনপির প্রার্থীরা দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে গোপনে বিরোধী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন। পাল্টা জবাবে জেলা নেতৃত্ব প্রার্থীদের সঙ্গে সাংগঠনিক সমন্বয়ের অভাব এবং প্রচারণার কৌশলগত সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছেন। এই পারস্পরিক দোষারোপ দলটির অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় একাধিক নেতা কালবেলাকে জানান, দুটি আসনেই জামায়াতের জয়ী হওয়ার অন্যতম কারণ আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক। এই ভোটগুলো বিএনপির পক্ষে আসার কথা ছিল। কিন্তু জেলা জজ আদালতের সাবেক একজন পিপির মামলা ও জামিন বাণিজ্যের কারণে খুব্ধ আওয়ামী সমর্থকদের ভোট গোপনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে চলে গেছে।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মেহেরপুর-১ আসনের পরাজিত প্রার্থী মাসুদ অরুণ কালবেলাকে বলেন, ‘নতুন গঠিত জেলা বিএনপির কমিটি আমাদের বিপক্ষে কাজ করেছে। জেলা বিএনপির নতুন সভাপতি জাবেদ মাসুদ মিলটন নির্বাচনী মাঠে নামেননি। মেহেরপুর-১ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় তাকে কখনোই দেখা যায়নি। আর মেহেরপুর-২ আসনে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন। এ ছাড়া পুরোটা সময় তিনি ঢাকায় কাটিয়েছেন। তার নির্দেশে কমিটির অন্য সদস্যরাও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গোপনে কাজ করেছেন।’
মেহেরপুর-২ আসনের পরাজিত বিএনপি প্রার্থী আমজাদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘জেলা বিএনপির একটি চক্র আমাদের ফেল করাতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করেছে। তারা মনে করেছে আমাদের হারালে এই আসনে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।’
পরাজিত বিএনপি প্রার্থীদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান বলেন, ‘জেলার দুই আসনেই দলীয় মনোনীত এমপি প্রার্থীরা জেলা কমিটিকে উপেক্ষা করেছেন। কমিটিকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব বলয় নিয়ে নির্বাচনে এগোনোর চেষ্টা করেন তারা। দলীয় ফান্ড থেকে পর্যাপ্ত অর্থ দেওয়া হলেও সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ায় চরম ভরাডুবি ঘটেছে।’
অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন বলেন, ‘কমিটির কেউ ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেনি, এ অভিযোগ ভিত্তিহীন। অতীতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রকাশ্য জোট থাকলেও এবারের ফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে জামায়াত ও আওয়ামী লীগর মধ্যে গোপন সমঝোতা হয়েছে, যা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থক অধ্যুষিত এলাকার ভোটের ফল বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে গেছে।’
এ প্রসঙ্গে কালবেলার কথা হয় মেহেরপুর জেলা জামায়াতের আমির ও মেহেরপুর-১ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাওলানা তাজ উদ্দিন খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই জয় শুধু দলীয় ভোটে নয়, দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণি পেশার মানুষের সমর্থনে এসেছে। এতে দলের নারী কর্মীদের ভূমিকাসহ সব নেতাকর্মী অক্লান্ত পরিশ্রম করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এর ফলে দুটি আসনেই দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।’
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মেহেরপুরের নির্বাচনী ফল দেখিয়ে দিয়েছে ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক আর আগের মতো নিশ্চয়তা দেয় না। সাংগঠনিক শক্তিমত্তা, মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি এবং ভোটারদের সঙ্গে সক্রিয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যোগাযোগ—এ তিনটি উপাদানই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করেছে।