

বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলা। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কুষ্টিয়ার ৪টি আসনই ছিল বিএনপির দখলে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সেই দুর্গ ভেঙে তিনটিতে জয় পেয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। মাত্র একটি আসনে জয় পেয়েছে বিএনপি। কী কারণে বিএনপির এমন বিপর্যয়, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দলীয় কোন্দল ও সমন্বয়হীনতার কারণেই বিএনপির এমন শোচনীয় পরাজয় বলে মনে করেন দলটির মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সমন্বয়হীনতার দায় স্বীকার করে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এবং কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘নির্বাচনী মাঠে নেতাকর্মীরা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করায় ঘটেছে এমন বিপর্যয়।’
তবে তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা বলছেন, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ফলই হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই সনদের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট। ২০২৪ সালের সেই গণআন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তরুণরাই। যাদের বড় একটি অংশ এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন। তারা বলেন, জুলাই মুভমেন্টের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি তরুণ প্রজন্মের যে প্রত্যাশা ছিল, অনেক ক্ষেত্রে তা পূরণ হয়নি। তাই যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা যেন তরুণদের ম্যান্ডেট বোঝে এবং সেই অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করে।
এদিকে জেলার নারী ভোটারদের মধ্যেও হিসাব বদলেছে। স্থানীয় নারী ভোটাররা বলছেন, সরকার আসে, সরকার যায়; আশ্বাসবাণী শোনানো হয়। কিন্তু নারী ক্ষমতায়নের বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি। বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং নারীদের হয়রানির ঘটনাগুলো প্রভাব ফেলেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তারা বলছেন, কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তি নয়, তারা পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করেই ভোট দিয়েছেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে তাদের প্রত্যাশা, নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা।
কুষ্টিয়া-৪: কুমারখালী ও খোকসা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ মেহেদি আহমেদ রুমীকে ৮ হাজার ৫৯৮ ভোটে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী আফজাল হোসেন। আফজাল হোসেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ২০১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৩ ভোট পেয়েছেন।
আসনটিতে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৪ হাজার ৪১৭। ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ২৬০ বা ৭২ দশমিক ৬৩। এই হার বিগত ৪টি জাতীয় নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ।
কুষ্টিয়া-৩: সদর উপজেলার এ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকারকে ৫৪ হাজার ৯১৭ ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হন জামায়াতের প্রার্থী আলোচিত ইসলামিক বক্তা মুফতি আমির হামজা। আমির হামজা দাঁড়িপাল্লা প্রতিকে ১ লাখ ৮২ হাজার ৪৭৬ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাকির হোসেন সরকার ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৯ ভোট।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৪ হাজার ৪১৭। ভোট দিয়েছেন ৩ লাখ ২১ হাজার ৩২৩ জন। ভোটের হার ৭২ দশমিক ৯২ শতাংশ।
কুষ্টিয়া-২: মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী রাগিব রউফকে ৪৮ হাজার ২৬২ ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল গফুর। আব্দুল গফুর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৩ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রাগীব রউফ চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮২১ ভোট। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭২ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
কুষ্টিয়া-১: জেলার মধ্যে দৌলতপুর উপজেলার এই একটি আসনই বিএনপির ঘরে গেছে। আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী রেজা আহমেদ বাচ্চু জামায়াতের প্রার্থী বেলাল উদ্দিনকে ৭৯ হাজার ২২৭ ভোটে পরাজিত করেন। রেজা আহাম্মেদ ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৯ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের বেলাল উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৮২ ভোট।
ভারত সীমান্তবর্তী এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪ হাজার ৫০৪। ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৪৩ জন ভোট দিয়েছেন। ভোটের হার ৬৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।