

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে লিজ দলিল প্রথা বাতিল করে সাফকবলা দলিল চালু করার পর সংস্থাটির কার্যক্রমে জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তবে একই সঙ্গে নন-ট্যাক্স রেভিনিউ ও ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের পতন দেখা দিয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে জাতীয় গৃহায়নের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজের জটিলতা কমেছে। এর ফলে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলেও সংস্থাটির আয় কমে গেছে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। কাজ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের নন-ট্যাক্স রেভিনিউ ও ভ্যাট আদায়ও কমেছে পাল্লা দিয়ে। এর মধ্যেই নতুন করে আরও ১০০ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ায় বেতন-ভাতা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কর্মকর্তারা।
জাতীয় গৃহায়নের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেছেন, ‘সরকার যে নতুন আইন করেছে, নিঃসন্দেহে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমেছে বহু গুণ। একই সঙ্গে জাতীয় গৃহায়নের রাজস্ব বাড়বে।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কিছুটা রাজস্ব আয় কমলেও ভবিষ্যতে তা বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা এবং পূর্ববর্তী বিধানে গৃহায়নের কোনো সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজ করতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু নতুন নিয়মে সাফকবলা দলিল চালু হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে আর কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হচ্ছে না, যা পুরোনো আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মকর্তারা জানান, আগে নামজারি, হস্তান্তর, বন্ধক, সেল পারমিশন, যৌথ নির্মাণ, পুনর্বাসন, আমমোক্তার নিয়োগ, কনভারসেশন, একত্রীকরণসহ ২০ থেকে ২৪ ধরনের কাজের জন্য ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সরকারি ফি দিতে হতো। কিন্তু নতুন আইনে এসব ফি বাতিল করা হয়েছে। এখন শুধু সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ শতাংশ জমা দিতে হয়। সাফকবলা দলিল, মালিকানা পরিবর্তন, দান, ব্যাংক ঋণ বা বন্ধকের ক্ষেত্রে কোনো ফি দিতে হচ্ছে না। ফলে সেবাগ্রহীতাদের আর গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে আসার প্রয়োজন পড়ছে না এবং তাদের ভোগান্তি বহু গুণে কমেছে।
এতে সরকারের রাজস্বে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গৃহায়নের হিসাব শাখা জানিয়েছে, আগে এক মাসে যে রাজস্ব আয় হতো, এখন তা তিন মাসেও হচ্ছে না। আগে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা নন-ট্যাক্স রেভিনিউ জমা হলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ থেকে ৪ কোটিতে। সর্বশেষ তিন মাসে মোট জমা হয়েছে মাত্র ১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ৮ কোটি, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৫ কোটি এবং ফেব্রুয়ারিতে ২ কোটি টাকা জমা হয়েছে। মোট হিসাবে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।
কর্মচারীরা জানান, সংস্থাটি নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে বেতন-ভাতা ও অবসর সুবিধার বড় অংশ বহন করে। বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও আয় হতে পারে মাত্র ২৪ থেকে ৩০ কোটি টাকা। ফলে পরিচালন ব্যয় ও
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একইভাবে আবাসিক প্লট বাণিজ্যিক করার ক্ষেত্রে আগে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত কনভারসেশন ফি দিতে হতো। এখন নতুন নিয়মে এ ধরনের কোনো ফি বা অনুমতির প্রয়োজন না থাকায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাবে এবং অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, অনুমতি ছাড়াই রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমি নিবন্ধন হওয়ায় সাব-রেজিস্ট্রারের পক্ষে জমির প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে ভবন থাকা সত্ত্বেও খালি জমি দেখিয়ে দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ ও আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধির আশঙ্কাও বাড়ছে।
জাতীয় গৃহায়নের এক সিনিয়র কর্মচারী বলেন, ‘জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। সে আইনে উল্লেখ আছে, গৃহায়ন নেওয়া কোনো সম্পত্তির কোনো কাজ করলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। এর ব্যত্যয় মানে আইনের লঙ্ঘন।’ তারা আরও বলেন, সংস্থার ফান্ডে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা থাকলেও তা দিয়ে বড় প্রকল্প বা জমি অধিগ্রহণের সক্ষমতা সীমিত।
কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নতুন আইনের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও সরকারের নন-ট্যাক্স রেভিনিউ ও ভ্যাট আদায়ের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এতে রাজস্ব বাড়বে এবং জাতীয় গৃহায়নের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত পরিকল্পিত আবাসন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।
চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, সরকার প্রতিটি কাজের জন্য ২ শতাংশ ভ্যাট বা ট্যাক্স নির্ধারণ করেছে এবং রেজিস্ট্রার অফিস জাতীয় গৃহায়নের কাছে অ্যাকাউন্ট নম্বর চেয়েছে। সেবাগ্রহীতাদের দেওয়া ভ্যাট বা ট্যাক্স ওই অ্যাকাউন্টে জমা হবে এবং খুব শিগগির এ প্রক্রিয়া চালু করা হবে।