

সিলেট মহানগরীসহ আশপাশের উপজেলাগুলোয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের ‘ভালো ইংরেজি শিক্ষা’ বা ‘নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষাদান’-এর আকাঙ্ক্ষা বাড়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হিড়িক দেখা দিলেও প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার মান নিয়ে।
বিশেষ করে মাসিক ফি, কোচিং, অতিরিক্ত ব্যাচ ক্লাসসহ নানা খাতে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠানেই নেই প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পাঠদানে আধুনিকতা কিংবা পর্যাপ্ত অবকাঠামো। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই চলছে পরীক্ষার ফল ও পাসের হারকে পুঁজি করে। ফলে শিক্ষার আসল গুণগত মান উপেক্ষিত। সিলেটে ২০১০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রাইভেট স্কুল-কলেজের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। নগরীর প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডেই গড়ে উঠেছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ব্যানার-ফেস্টুনে ‘নির্ভরযোগ্য’, ‘আধুনিক’, ‘ইংলিশ ভার্সন’, ‘বিশেষ কেয়ার’ ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি ঝুলছে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন কতটুকু, সে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাম্প্রতিককালে সিলেটে যত্রতত্র গড়ে উঠছে প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই নীতিমালা না মেনে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান পরিচালকরাও নিজেদের ইচ্ছামতো আদায় করছেন বেতন, ভর্তি ও কোচিং ফি। শিক্ষার চেয়ে বাণিজ্যই মুখ্য হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে নেই লেখাপড়ার পরিবেশ। চাহিদার তুলনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান কম থাকায় বাধ্য হয়ে অনেক অভিভাবক সন্তানদের পাঠাচ্ছেন এসব স্কুলে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো থেকে শুরু করে শিক্ষার পরিবেশ এবং লেখাপড়ায় মান নিয়ে সন্তুষ্ট নন অভিভাবকরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ালেই মানোন্নয়ন হয় না। মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার দিকগুলো উপেক্ষিত থাকলে পুরো প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের দাবি, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, পর্যাপ্ত শিক্ষকমণ্ডলী কিংবা মানসম্মত পাঠদান পদ্ধতির অভাব রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা না পেয়ে কোচিং-নির্ভর হয়ে পড়ছে।
এদিকে, শিক্ষাবিষয়ক কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর কঠোর নজরদারি না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো ফি নির্ধারণ করছে। পাঠ্যসূচিও নিজেদের মতো করে পরিচালনা করছে। তবে অভিভাবকরা বলছেন, অভিনব বিজ্ঞাপন আর বিল্ডিং দিয়ে শিক্ষার মান হয় না। অভিভাবকদের কেউ কেউ বলছেন, শিক্ষকরা কেবলই পরীক্ষায় ভালো ফল দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সৃজনশীল চিন্তা, নৈতিকতা কিংবা নেতৃত্ব গঠনের দিকে তেমন নজর নেই।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানেই খারাপ, তা নয়। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে গুণমান নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জরুরি। অবশ্য কিছু ভালো মানের প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে, যারা প্রকৃত শিক্ষা প্রদানে আন্তরিক। তবে এসব ব্যতিক্রম ছাড়া সার্বিক চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়।
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শিক্ষাবিদ হায়াতুল ইসলাম আকঞ্জি কালবেলাকে বলেন, সিলেটে খুব ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, এটা সত্য। রাতারাতি ভালো ফলের জন্য কিছু অভিভাবক বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হন। যেনতেনভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার ব্যয় বাড়লেও শিক্ষার মান কেন কমছে—এমন প্রশ্নের জবাবে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুদ রানা বলেন, ‘করোনার সময়ে শিক্ষার ব্যাপক ছন্দপতন ঘটে। ওই সময় থেকে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ে। এ ছাড়া অটোপাস আরেকটি বড় কারণ। ওই সময় থেকে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার কমে যায়। তবে এসব সমস্যার সমাধানে আমরা এরই মধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানগুলোকে উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার ৮০ শতাংশের কম হলে তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে না। এজন্য অভিভাবকের স্বাক্ষরসহ অঙ্গীকারনামা নেওয়া হবে। এ ছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। বিশেষ করে আইসিটি ও ইংরেজি শিক্ষকের সংকট রয়েছে। শিক্ষক সংকট নিরসনে আমরা এনটিআরসিএর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।’