

ব্যস্ততার শহর ঢাকা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজট, কর্মচাপ আর ছুটে চলার গল্পে যেখানে প্রতিদিনের জীবন বন্দি, সেই শহরই আজ বদলে যাবে অন্য এক আবহে। সন্ধ্যা নামতেই রাজধানীর তিন প্রান্তে জ্বলে উঠবে আলাদা তিনটি মঞ্চ। কোথাও কিংবদন্তিকে জানানো হবে সম্মান, কোথাও প্রজন্মের শিল্পীরা গাইবেন তাদের প্রিয় শিল্পীর গান, আবার কোথাও হাজারো দর্শকের সামনে উঠবেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আতিফ আসলাম। সব মিলিয়ে আজকের ঢাকা যেন শুধু একটি শহর নয়, এক বিশাল সংগীতমঞ্চ।
সংগীতপ্রেমীদের জন্য ২৪ জুলাই হয়ে উঠছে বিশেষ একটি দিন। কারণ, একই দিনে তিনটি ভিন্ন স্বাদের আয়োজন নিয়ে রাজধানী সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক বিরল সংগীত উৎসবের।
সবচেয়ে আবেগঘন আয়োজনটি থাকছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে। সেখানে দেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লাকে জানানো হবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান। পাশাপাশি থাকবে তার একক সংগীতানুষ্ঠান। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা, উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবিসহ ১৮টি ভাষায় দশ হাজারের বেশি গান গেয়ে উপমহাদেশের সংগীতভুবনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। আজকের সন্ধ্যায় সেই দীর্ঘ পথচলার প্রতি জানানো হবে শ্রদ্ধা।
অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব এখানেই শেষ নয়। বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় এই আয়োজনের টিকিট বিক্রির অর্থ দেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে। অর্থাৎ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মানবিকতার এক অনন্য বার্তা। দর্শকরা শুধু গান শুনতেই আসবেন না, তারা হবেন একটি মানবিক উদ্যোগেরও অংশীদার।
এদিকে রাজধানীর বনানীর যাত্রাবিরতি রেস্টুরেন্টে থাকবে একেবারেই ভিন্ন স্বাদের আয়োজন। ‘সেলিব্রেটিং বাপ্পা মজুমদার’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও সুরকার বাপ্পা মজুমদারকে সম্মান জানাবেন বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা। বাপ্পা মজুমদার নিজে মঞ্চে বসে শুনবেন তারই সৃষ্টি করা গান।
জয় শাহরিয়ার, খৈয়াম সানু সন্ধি, ইউসুফ আহমেদ খান, ফারহিন খান জয়িতা, খান মাইদুল ইসলাম শুভ, এলিটা করিম, কারিশমা সানু সভ্যতা ও সায়েমুল ইসলাম রিয়াদ গাইবেন বাপ্পার জনপ্রিয় সব গান। ‘পরী’, ‘ধুলো পড়া চিঠি’, ‘রাতের ট্রেন’, ‘কখনো ইচ্ছে হয়’, ‘দিন বাড়ি যায়’সহ অসংখ্য গান নতুন কণ্ঠে ফিরে আসবে নতুন আবহে।
নিজেকে নিয়ে এমন আয়োজন প্রসঙ্গে বাপ্পা মজুমদারও উচ্ছ্বসিত। তার ভাষায়, নিজের গান অন্য শিল্পীদের কণ্ঠে, আবার নিজের সামনেই শুনতে পারা একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলা গানে যে শিল্পী নিজের স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন, তার জন্য এমন আয়োজন নিঃসন্দেহে এক বিশেষ সম্মান।
অন্যদিকে রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউতে থাকবে দিনের সবচেয়ে বড় জনসমাগমের সম্ভাবনা। বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ ঢাকার মঞ্চে গান গাইবেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আতিফ আসলাম। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এ কনসার্ট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা। মাঝখানে অনুষ্ঠান স্থগিত হওয়ার গুঞ্জন ছড়ালেও আয়োজকরা তা নাকচ করে নির্ধারিত সময়েই আয়োজনের ঘোষণা দেন। অবশেষে বুধবার গভীর রাতে ঢাকায় পৌঁছেছেন আতিফ, আর আজ তিনি উঠবেন মঞ্চে।
‘তেরে বিন’, ‘পেহলি নজর মে’, ‘তেরা হওনে লাগা হুঁ’, ‘জিনে লাগা হুঁ’, ‘দিল দিয়াঁ গাল্লাঁ’ কিংবা ‘তাজদার-ই-হারাম’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গান দিয়ে উপমহাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন আতিফ আসলাম। বাংলাদেশেও তার জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের। তাই রাজধানীর এই কনসার্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগীতপ্রেমীদের উপস্থিতি প্রত্যাশা করছেন আয়োজকরা।
তিনটি আয়োজনের ধরন আলাদা হলেও একটি জায়গায় এসে তারা মিলিত হয়েছে—সংগীতের শক্তিতে। একদিকে রুনা লায়লার মতো কিংবদন্তিকে সম্মান জানিয়ে সংগীত ঐতিহ্যকে উদযাপন, অন্যদিকে বাপ্পা মজুমদারের গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে তুলে ধরে সৃষ্টিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ, আর আন্তর্জাতিক তারকা আতিফ আসলামের উপস্থিতিতে বিশ্বসংগীতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার বার্তা।
একই দিনে রাজধানীতে এমন বৈচিত্র্যময় তিনটি সংগীত আয়োজন খুব বেশি দেখা যায় না। এটি শুধু তিনটি কনসার্ট নয়; তিনটি প্রজন্ম, তিনটি অনুভূতি এবং তিনটি ভিন্ন সংগীতধারার এক অনন্য মিলনমেলা। কোথাও থাকবে নস্টালজিয়া, কোথাও থাকবে শ্রদ্ধা, কোথাও উচ্ছ্বাস আর তারুণ্যের উন্মাদনা।
আজ তাই ঢাকার আকাশে শুধু যানবাহনের শব্দ নয়, ভেসে বেড়াবে সুরের মূর্ছনা। নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বে গান, করতালি আর ভালোবাসার প্রতিধ্বনি। ব্যস্ত রাজধানী আজ কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও হয়ে উঠবে এক সুরের শহর, যেখানে তিনটি মঞ্চ, অসংখ্য শিল্পী আর হাজারো দর্শক মিলিয়ে রচিত হবে সংগীতের এক স্মরণীয় সন্ধ্যা।