লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ০৯:৩২ এএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ১২:৪৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

সব হারিয়ে নিঃস্ব শহীদ মিরাজের মা চান মাথা গোঁজার ঠাঁই

শহীদ ছেলের ঘুমানো বালিশ নিয়ে মায়ের আর্তনাদ। ইনসেটে শহীদ মিরাজুল ইসলাম মিরাজ। ছবি : কালবেলা
শহীদ ছেলের ঘুমানো বালিশ নিয়ে মায়ের আর্তনাদ। ইনসেটে শহীদ মিরাজুল ইসলাম মিরাজ। ছবি : কালবেলা

আজ ৫ আগস্ট, মুক্তির দিন। এইদিন লালমনিরহাটের শহীদ মিরাজ ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়। দিনটির কথা স্মরণ করে শহীদ মিরাজের মা মোহছেনা বেগমের কান্না যেন থামছে না। বাড়ির পাশে ছেলের কবর চোখে পড়লেই দুচোখ বেয়ে জল আসে। ছেলের কথা মনে পড়লেই কবরের পাশে গিয়ে চোখের জল ফেলেন দুঃখিনী মা।

এদিকে ছেলে হারানোর শোকে অসুস্থ হয়ে বাবা আব্দুস ছালামও পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। বড় ছেলে আর স্বামীকে হারিয়ে এখন দুচোখে অন্ধকার দেখছেন শহীদ জননী মোহছেনা বেগম। সংসারের খরচ মেটাতে বাধ্য হয়ে শহীদ মিরাজের স্কুলপড়ুয়া ছোট ভাই মেজবাউল স্কুলের ফাঁকে দোকান চালাচ্ছে। স্কুলে গেলে বন্ধ হয় দোকান আর দোকান চালু রাখলে বন্ধ হয় স্কুলে যাওয়া।

শহীদ মিরাজুল ইসলাম মিরাজের বাড়ি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া গ্রামের আনসার খাঁর পুকুরপাড় এলাকা। ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ৫ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানার সামনে মাছের আড়ত এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ৮ আগস্ট রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মিরাজ।

সোমবার (৪ আগস্ট) বিকেলে শহীদ মিরাজের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ডোরা নদীর পাড় ঘেঁষা বাড়ি তাদের। বাড়ি যাবার রাস্তাটি সম্প্রতি সরকারিভাবে পাকা করে দেওয়া হয়েছে। চাচা আবুল কালামের জমিতে একটা লম্বা টিনশেড ঘরের মধ্যে বেড়া দিয়ে দুটি কক্ষ করা হয়েছে। সেই দুটি কক্ষ নিয়েই শহীদ মিরাজের বাড়ি। পাশের টিনে ঘেরা বাথরুম। অন্য প্রান্তে টিনের চালা দিয়ে সেখানে রান্না করেন শহীদ জননী মোহছেনা বেগম। বইগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে টেবিলে। এ সময় এই প্রতিবেদককে দেখে মিরাজের মা শহীদ ছেলের বিছানায় বসে ছেলের ঘুমানো বালিশের ওপর হাত বুলিয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন।

মিরাজের পরিবারের সদস্যরা ও স্থানীয়রা জানান, ২০২১ সালে এসএসসি পাস করে সিএনজিচালক বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় চলে গিয়েছিলেন মিরাজ। সেখানে ভাড়া বাসায় থাকত মিরাজের পুরো পরিবার। ঢাকার দনিয়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলেন মিরাজ। পড়ালেখার পাশাপাশি একটি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন তিনি। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, ছোট ভাইয়ের লেখাপড়াসহ পুরো সংসার চলত মিরাজের আয়েই।

গত বছর ৫ আগস্ট হাসিনার পদত্যাগের একদফা দাবিতে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে মাছের আড়ত এলাকায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন মিরাজ। সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। এ অবস্থায় মিরাজকে স্থানীয়রা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করা হয়। ৮ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

মিরাজের মৃত্যুতে নিভে যায় তাদের সংসারের আলো। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। কষ্টার্জিত টাকায় কেনা পাঁচ শতাংশ জমিতে বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল তাদের। কিন্তু মিরাজের মৃত্যুতে মাঝপথে থেমে যায় সেই স্বপ্ন। জমিটুকুও হয়ে যায় বেদখল। দলিল দিলেও দখল বুঝিয়ে দেননি প্রতিবেশী দুলাল। সে জমি দখলে নিতে থানা-পুলিশ করেও সুফল মেলেনি। হারতে হয়েছে টাকার কাছে। পড়ালেখা শেষে চাকরি করে বেদখল জমি উদ্ধার করে বাড়ি করে তবেই ঢাকা থেকে ফেরার স্বপ্ন ছিল মিরাজের।

ছেলের মৃত্যুর শোকে অসুস্থ বাবা আব্দুস ছালাম বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করে সরকারিভাবে পাঁচ লাখ টাকা পান। সেই টাকায় মহিষখোঁচা বাজারে একটি খাস জমির ব্যবস্থা করে দেন স্থানীয় কয়েকজন। সেই জমিতে দোকান করে ব্যবসা শুরু করেন আব্দুস ছালাম। কিন্তু ছেলে হারানোর শোকে হঠাৎ তিনিও স্ট্রোক করে মারা যান। আবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যায় মিরাজের পরিবার।

উপার্জনক্ষম বড় ছেলে আর স্বামীকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন মোহছেনা, তার ছেলে আর শাশুড়ি সালমা খাতুন। এই প্রতিবেদকের সামনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে বেদখলে থাকা পাঁচ শতাংশ জমি উদ্ধারে প্রশাসনের কছে আকুতি জানিয়েছেন শহীদ মিরাজের মা মোহছেনা বেগম।

শহীদ মিরাজের দাদি সালমা খাতুন বলেন, আগে মিরাজ আমার ওষুধ কিনে দিত, চিকিৎসার দেখভাল করত। তার মৃত্যুর পরে আমার ছেলে আব্দুস ছালাম ওষুধের ব্যবস্থা করত। এখন ছোট নাতি স্কুলের ফাঁকে দোকান করে যা আয় করছে, তা দিয়ে কোনোমতে খাবার জুটছে।

শহীদ মিরাজের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, শোনা যাচ্ছে, শহীদ পরিবারকে লাখ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে প্রথম দফায় পাঁচ লাখ টাকা আর বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটা ছাড়া কিছুই পাইনি। আমাদের কেনা জমি বেদখল হয়ে আছে। সেই জমিও উদ্ধার করে দিতে পারেননি সরকারি কর্মকর্তারা। ভাইকে কারা গুলি করল? তা জানতে চাই। চাই দ্রুত খুনিদের বিচার।

মিরাজের মা মোহছেনা বেগম বলেন, বাড়ির জন্য কেনা জমিটুকু দখল পেতে থানা-পুলিশ করেছিল মিরাজ আর তার বাবা। কিন্তু টাকার কাছে তারা হেরে গেছেন।

তিনি বলেন, বাজারের সরকারি জমিতে দোকান করার সুযোগ পেয়েছি। সেই দোকান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চলছে কোনোমতে। এখন কেউ আমাদের তেমন খবর নেয় না। আমি আদরের ছেলের মৃত্যুর কয়েক মাসের ব্যবধানে স্বামীকে হারিয়েছি। আমার মতো দুঃখী এ দুনিয়ায় নেই কেউ—এ বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১২ আরোহী নিয়ে উড়ছিল বিমান, মাটিতে আছড়ে পড়তেই সব শেষ

পার্থকে সভাপতি করে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির খবরে কমেছে তেলের দাম

শীর্ষে ওঠার লড়াইয়ে তিউনিশিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে সুইডেন

পুষ্টিগুণে ভরপুর দেশি ফল ডেউয়া

শেষ মুহূর্তে গোল, জয় দিয়েই আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু

যে দলগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি গোল খেয়েছে আর্জেন্টিনা

আরব সাগরে আটকে পড়া ১৪ ভারতীয় নাবিককে উদ্ধার করল যুক্তরাষ্ট্র

নতুন ইউনিয়ন পেল শিবগঞ্জ উপজেলা

এইচএসসি ২০২৬ / নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিতে কেন্দ্রে চলবে কড়া নজরদারি

১০

অটোরিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে প্রাণ গেল শিক্ষিকার

১১

নতুন ইরান চুক্তি জেসিপিওএর চেয়ে বেশি ভালো হবে না : ওবামা

১২

স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যাচেষ্টা, পাষণ্ড স্বামী গ্রেপ্তার

১৩

সিলেটে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, শনাক্ত ২৭

১৪

বেনজীরকে দেশে পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দিল আমিরাত

১৫

 শান্তি চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষর

১৬

সোমবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

১৭

দিল্লির বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

১৮

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

১৯

দেশে ব্যাপক ঝড়-বৃষ্টির শঙ্কা, নদীবন্দরেও সতর্কতা

২০
X