হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাতিয়ার ৮০ গ্রাম, পানিবন্দী ৫০ হাজার মানুষ

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে জনবসতি। ছবি: কালবেলা
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে জনবসতি। ছবি: কালবেলা

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ, জোয়ারের পানি এবং অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৮০টি গ্রাম এখনো জলাবদ্ধতায় ডুবে রয়েছে। কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও অন্তত ৫০ হাজার মানুষ এখনও পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার ঠিকমতো খাবার রান্না করতে পারছে না। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। অন্যদিকে আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের তলিয়ে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক ও মৎস্যচাষীরা।

উপজেলার নিঝুমদ্বীপ, সোনাদিয়া, বুডিরচর, হরনী, চানন্দী, চরকিং, সুখচর, নলচিরা, জাহাজমারা, তমরদ্দি ও চর ঈশ্বর ইউনিয়নসহ হাতিয়া পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও বাড়িঘরের আঙিনা, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও কাঁচা-পাকা সড়ক ও হাটবাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় ঘরের ভেতরেও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, টানা বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় নিচু এলাকার পানি বের হওয়ার সুযোগ পায়নি। ফলে ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, টয়লেট এবং গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার কয়েক দিন ধরে শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। হাজার হাজার একর আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের পানিতে ডুবে গেছে। অনেক ঘের থেকে মাছ ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র মৎস্যচাষীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ও শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল প্রায় বন্ধ। জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্বজনদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খাল-নালা ভরাট এবং টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমাদের চারপাশে কোনো বেড়িবাঁধ নেই। জোয়ার এলেই পানি উঠে যায়। এবার ছয় দিনের টানা বৃষ্টিতে রান্নাঘর ডুবে গেছে। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। দ্রুত পানি না নামলে আরও বিপদ হবে।’

বুডিরচর ইউনিয়নের কৃষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত ও মাছের ঘের—সব শেষ। কয়েক মাসের পরিশ্রম এক বৃষ্টিতেই নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে চাষ করার মতো পুঁজিও নেই।’

নলচিরা ইউনিয়নের রিকশাচালক মো. আমির বলেন, ‘রাস্তায় পানি থাকায় মানুষ ঘর থেকে বের হয় না। সারাদিন রিকশা নিয়ে বসে থাকি। মালিকের ভাড়া তুলতে পারছি না। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।’

হাতিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আনিসুর রহমান বলেন, হাতিয়া উপজেলায় প্রায় ৭০-৮০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্ধী। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার প্রস্তুতি রয়েছে।

পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আফ্রিনা বেগম বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে আমাদের এলাকা পানিতে তলিয়ে আছে। চুলা ডুবে গেছে, রান্না করা যাচ্ছে না। নলকূপও পানির নিচে। বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র। সরকারিভাবে সামান্য কিছু শুকনো খাবার দেওয়া হলেও সবাই তা পায়নি। দ্রুত ত্রাণ না এলে অনেক পরিবার না খেয়ে থাকবে।’

হরনী ইউনিয়নের বাসিন্দা নাসিমা আক্তার বলেন, ‘বাড়ির ভেতর হাঁটুসমান পানি। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। রাতে ভয়ে ঘুম আসে না। এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি আমাদের খোঁজ নিতে আসেননি।’

হাতিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘হাতিয়া উপজেলায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তার প্রস্তুতি রয়েছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেল ইকবাল বলেন, ‘হাতিয়া নদীবেষ্টিত একটি উপজেলা। কয়েকটি এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক এলাকার পানি নামতে শুরু করেছে। ২৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।’

বৃষ্টি কমলেও এখনো অনেক এলাকায় পানি নামেনি। দ্রুত পানি নিষ্কাশন, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষীদের পুনর্বাসনে জরুরি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হারেনি যে দুই দল

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে বড় ধাক্কা খেল সুইজারল্যান্ড

সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গোপিকা শ্যাম, সেক্রেটারি দীপক দাস 

প্রধানমন্ত্রী / তরুণদের সম্ভাবনাকে অগ্রগতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা অন্যতম লক্ষ্য

২১তম বিসিএস প্রশাসনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সম্মিলন

‘ভালো চর্বি শরীরের শত্রু নয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারই বড় ঝুঁকি’

ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন আজ

বন্যায় বিপর্যস্ত চট্টগ্রামে এবার ব্যাংকে ডাকাতির গুজব

সেই মেরিনোই যখন লা রোজাদের ত্রাতা

স্থগিত নয় সিলেট শিক্ষাবোর্ডের শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষা

১০

শেষ মুহূর্তের গোলে বিদায় নিল বেলজিয়াম, সেমিফাইনালে স্পেন

১১

ইরান আমাকে হত্যা করলে, নজিরবিহীন ‘বোমা হামলা’ হবে: ট্রাম্প

১২

রূপগঞ্জের ৩৪ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সংসদ ভবন পরিদর্শন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ

১৩

র‍্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধানকে ধন্যবাদ জানিয়ে পরীমনির পোস্ট

১৪

সমতায় থেকে বিরতিতে গেল বেলজিয়াম-স্পেন

১৫

এবার নোরা ফাতেহির ফেক ভিডিও ভাইরাল

১৬

সেমির লড়াইয়ে মাঠে নামল স্পেন-বেলজিয়াম

১৭

বিতর্কের পর বিশ্বকাপে ভিএআরে বড় পরিবর্তন আনল ফিফা

১৮

বাঁশখালীর বন্যার্ত মানুষের পাশে ঢাবি ছাত্রদল নেতা নাছির উদ্দিন শাওন

১৯

‘শুধু হিন্দুরাই বৃত্তি পেয়েছে’ দাবিতে ভুল তথ্য ভাইরাল

২০
X