

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে শত শত পোশাক কারখানার মালিক সংগঠনটির নির্বাচনে ভোটাধিকার হারাতে পারেন। সংগঠনের সংঘবিধিতে নতুন একটি ধারা সংযোজনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিজিএমইএর ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের একটি অংশের শঙ্কা, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে শুধু অনেক সদস্যের ভোটাধিকারই সীমিত হবে না, বরং বন্ধ ও আংশিক বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এটি বিজিএমইএ’র ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও নির্বাচনি সমীকরণেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, আগামী ২০ জুন অনুষ্ঠেয় বিজিএমইএ’র বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) সংগঠনের সংঘবিধিতে নতুন ধারা ৫(গ) সংযোজনের একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
প্রস্তাবিত ধারায় বলা হয়েছে, যে সদস্য বর্তমানে রপ্তানি কার্যক্রমে নিয়োজিত নন, অথবা বিজিএমইএ থেকে একচেটিয়াভাবে ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) সেবা গ্রহণ করেন না, তিনি বিজিএমইএ’র পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে ভোটার তালিকাভুক্ত হতে, কিংবা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।
সদস্যের সর্বশেষ অর্থবছরের রেকর্ড, বিশেষ করে রফতানি আয়ের প্রমাণ হিসেবে প্রোসিডস রিয়েলাইজেশন সার্টিফিকেট (পিআরসি), এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর অর্থ হলো, যেসব সদস্যের কারখানা বর্তমানে উৎপাদন বা রফতানি কার্যক্রমে নেই, কিংবা যেসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কারণে বন্ধ রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন।
বিজিএমইএ’র অনেক সদস্য রয়েছেন, যাদের কারখানা বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সংকট, ব্যাংক ঋণের জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মন্দা কিংবা প্রশাসনিক নানা চাপের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে— কিন্তু তারা এখনো সংগঠনের সদস্য হিসেবে রয়েছেন এবং নির্বাচনে ভোটাধিকার ভোগ করেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, গত দেড় দশকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা কারণে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা হারিয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশ এখনো কারখানা পুনরায় চালুর চেষ্টা করছেন। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এই উদ্যোক্তারা বিজিএমইএর নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।
বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে সরকারের সাম্প্রতিক শিল্প পুনরুদ্ধার কর্মসূচির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছেন।
এই তহবিলের আওতায় বন্ধ কলকারখানা ও সেবা খাত পুনরুজ্জীবনের জন্য একাই ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ রাখা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
নীতিনির্ধারকদের মতে, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় সচল হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে।
কিন্তু বিজিএমইএ’র প্রস্তাবিত সংশোধনী কার্যকর হলে বন্ধ ও আংশিক বন্ধ কারখানার মালিকরা সংগঠনের নির্বাচনি প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়বেন। ফলে অনেক উদ্যোক্তার মধ্যে নিরুৎসাহ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বিজিএমইএর প্রস্তাবিত এই সংশোধনী এখন পোশাক খাতের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু ভোটাধিকার সংক্রান্ত একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান, ব্যবসায়ী রাজনীতি এবং সংগঠনটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্ন।
আগামী ২০ জুনের বিশেষ সাধারণ সভায় সদস্যরা প্রস্তাবটির পক্ষে-বিপক্ষে কী অবস্থান নেন, সেটির ওপর নির্ভর করবে বিজিএমইএর নির্বাচনি কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ভবিষ্যৎ রূপ।