

অ্যাপে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নীতিমালা না মেনে সেবা পরিচালনা এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—এসব অভিযোগের মধ্যেই রাইড শেয়ারিং সেবায় ভোক্তাদের অভিযোগ গ্রহণ ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
সংস্থাটি বলছে, রাইড শেয়ারিংয়ের জন্য আলাদা কোনো সেবা শ্রেণি না থাকলেও এটি পরিবহন সেবার আওতায় পড়ে। ফলে অতিরিক্ত ভাড়া বা সেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ সরাসরি কিংবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানাতে পারবেন যাত্রীরা। এদিকে আট বছর আগে প্রণীত ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা-২০১৭’-এর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বিধান এখনো বাস্তবায়ন না হওয়ায় খাতটির কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাইড শেয়ারিং সেবাকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে ২০১৭ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা’। নীতিমালায় বিআরটিএর অনুমোদন, সেবা এলাকায় নিজস্ব কার্যালয়, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এলাকায় নিবন্ধিত কমপক্ষে ১০০টি যানবাহন, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালক, ডিজিটাল লেনদেন, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং জরুরি (এসওএস) সুবিধা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়।
এ ছাড়া চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, অনলাইনে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, বিআরটিএর ওয়েব পোর্টালের সঙ্গে তথ্য সংযুক্তি, প্রতিটি যাত্রার তথ্য সংরক্ষণ, পুলিশ কন্ট্রোল রুমে জরুরি বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা, অনুমোদিত পার্কিং এবং যাত্রা শুরুর আগেই সম্ভাব্য ভাড়া জানিয়ে দেওয়ার বিধানও রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আট বছর পরও এসব গুরুত্বপূর্ণ শর্তের অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়নি।
রাইড শেয়ারিং ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, অনেক চালক অ্যাপে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি অর্থ ছাড়া গন্তব্যে যেতে চান না। আবার অনেক চালক অ্যাপ বন্ধ রেখে সরাসরি যাত্রী তোলেন। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাসস্ট্যান্ডে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির জটলা সৃষ্টি করে ট্রাফিক ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি উবার, পাঠাও ও ওভাইয়ের বিরুদ্ধে চালকদের অসদাচরণ, নারী যাত্রীদের হয়রানি, কার্যকর এসওএস সুবিধার অভাব এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশে সংরক্ষণের অভিযোগও রয়েছে।
চাকরিজীবী জাহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে উবার বা অন্য কোনো অ্যাপ ব্যবহার করা যেন অন্ধ হয়ে একা একা রাস্তা পার হওয়ার মতো অনিশ্চিত। একই গন্তব্যে ভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাড়া দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
দীর্ঘদিন রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত রুবেল জানান, যাত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক ঘটনার পর তার অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেয় কোম্পানি। এরপর গত আট বছর ধরে তিনি অ্যাপ ব্যবহার না করে সড়কে দাঁড়িয়ে সরাসরি যাত্রী পরিবহন করছেন।
নীতিমালায় অনুমোদিত স্ট্যান্ড বা পার্কিংয়ের বাইরে যাত্রী সংগ্রহের সুযোগ না থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই রাইড শেয়ারিং যানবাহনের জটলা দেখা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, উবার ও পাঠাও নীতিমালার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। সার্টিফিকেট নবায়ন ছাড়াই দীর্ঘদিন সেবা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদন্ত বিভাগের পরিচালক মো. মাসুম আরেফিন বলেন, ভোক্তা অধিকারে রাইড শেয়ারিং সেবা নামে আলাদা কোনো সেবা নেই। তবে পরিবহন সেবা ভোক্তা অধিকারের আওতায় পড়ে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ এলে ভোক্তা অধিদপ্তর বিষয়টি আমলে নিতে পারে। যাত্রীরা সরাসরি বা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা জরিমানা করা হয়।
ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সজিব হোসেন বলেন, নীতিমালায় স্ট্যাম্প পেপারে চালক, মালিক ও কোম্পানির মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির কথা থাকলেও বাস্তবে অনলাইনের ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস’ গ্রহণের মাধ্যমেই চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে। অধিকাংশ চালক না বুঝেই এতে সম্মতি দেন। তিনি আরও বলেন, উবারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার দেশের বাইরে থাকায় অভিযোগের দ্রুত সমাধান হয় না। তাই চালকদের ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় আনা, কমিশন কমানো এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ঢাকা রাইড শেয়ারিং ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হালিম তালুকদার বলেন, নতুন ভাড়া কাঠামো এখনো কার্যকর না হওয়ায় কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো ভাড়া নির্ধারণ করছে। এতে চালকদের ওপর অতিরিক্ত কমিশনের চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অনেকেই অ্যাপের বাইরে ট্রিপ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, বর্তমানে বিআরটিএর তালিকায় ১৯টি রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান থাকলেও সক্রিয় রয়েছে মাত্র তিন থেকে চারটি। প্রায় ৩৫ হাজার যানবাহন নিবন্ধিত রয়েছে, যার মধ্যে উবারে ২৬ থেকে ২৭ হাজার এবং পাঠাওতে ৫ থেকে ৬ হাজার।
অনুমোদন ছাড়া ইনড্রাইভ পরিচালনার অভিযোগ তুলে তিনি জানান, বিটিআরসির মাধ্যমে অ্যাপটি বন্ধের চেষ্টা চলছে। নীতিমালা না মানা বা সার্টিফিকেট নবায়ন না করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। সবকিছু জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, রাইড শেয়ারিং সেবা নীতিমালার বাইরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে পেশায় পরিণত হয়েছে। চালকদের প্রশিক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা, পার্কিং ব্যবস্থাপনা ও বিআরটিএর তদারকির ঘাটতিকে তিনি বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোকে কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারা বিআরটিএর ব্যর্থতা। পাশাপাশি বিদেশে ব্যবহারকারীদের তথ্য সংরক্ষণের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান জানান, রাইড শেয়ারিং নীতিমালা হালনাগাদের কাজ চলছে। বিদ্যমান নীতিমালাকে সময়োপযোগী করে সেবা আরও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নীতিমালা না মানা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য ড. মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, বিষয়টি পর্যালোচনা করে কোনো প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণ বা অপরাধের আলামত রয়েছে কি না, তা কমিশন বিচার-বিশ্লেষণ করবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাইড শেয়ারিং নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে যাত্রী নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।