

পাশের বাসার আরিফ ভাই ঘোর আর্জেন্টাইন সমর্থক। সেদিন দুপুরে তার স্ত্রী রান্না করেছেন মুরগির হলুদ-ঝাল তরকারি, রঙটা একটু বেশিই উজ্জ্বল হলুদ হয়ে গেছে। থালায় ভাত বেড়ে দেওয়ার পর আরিফ ভাই একনজর তাকিয়েই গম্ভীর মুখে বলে উঠলেন, ‘এই তরকারি দিয়ে আজ ভাত খাওয়া যাবে না, এটা তো একদম ব্রাজিলের জার্সির রঙ!’ ভাবি প্রথমে ভাবলেন রসিকতা; কিন্তু আরিফ ভাই সেদিন সত্যিই তরকারি সরিয়ে শুধু শাক দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের আড্ডায় গল্পটা এখন নিছক কৌতুক হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বটে, কিন্তু এই ছোট্ট ঘটনাটাই আসলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ফুটবলের জন্য বাংলাদেশের মানুষের আবেগ কতটা গভীর, কতটা সর্বগ্রাসী; যা দুপুরের ভাতের থালাতেও যার নাগাল এড়ায় না।
বিশ্বকাপ চলছে। কোটি কোটি মানুষের মতো বাংলাদেশও ডুবে গেছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাঠে যখন বিশ্বসেরা তারকারা শিরোপার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের বাংলাদেশেও যেন চলছে আরেকটি সমান্তরাল বিশ্বকাপ। ঢাকার টিএসসি, চট্টগ্রামের আড্ডাঘর, রাজশাহীর চায়ের দোকান, সিলেটের অলিগলি কিংবা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘর; সবখানে একই দৃশ্য। কোথাও নীল-সাদা আর্জেন্টিনার পতাকা, কোথাও হলুদ-সবুজ ব্রাজিলের রং। রাতভর খেলা দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথার যুদ্ধ, বন্ধুদের খোঁচাখুঁচি, জয়ে উল্লাস আর পরাজয়ে দীর্ঘশ্বাস। এই দৃশ্য যতটা মনোমুগ্ধকর, ততটাই বিস্ময়করও।
মানচিত্রে আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিল বাংলাদেশের প্রতিবেশী নয়। আমাদের ভাষা, ইতিহাস কিংবা রাষ্ট্রিক স্বার্থের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ কোনো যোগ নেই। তবু পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে, যেখানে অন্য একটি দেশের জাতীয় দলকে ঘিরে এমন গভীর আবেগ, এমন আত্মপরিচয় তৈরি হয়। আর এখানেই প্রশ্নের শুরু। আমরা কি শুধু ফুটবলকে ভালোবাসি, নাকি ফুটবলের ভেতর নিজেদের জীবনের অপূর্ণতা, হতাশা আর পরিচয়ের একটি বিকল্প আশ্রয় খুঁজে পাই?
বাংলাদেশ একটি তরুণ রাষ্ট্র। জনসংখ্যার বড় অংশই যুবসমাজ, যারা প্রতিদিন মুখোমুখি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রতিযোগিতা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই মানুষ আনন্দ খোঁজে, কিছু সময়ের জন্য দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার একটি উপলক্ষ খোঁজে। ফুটবল সেই বিরল ভাষাগুলোর একটি, যা ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলিয়ে মানুষকে এক আবেগে একত্র করতে পারে। এই দিক থেকে ফুটবল নিঃসন্দেহে সভ্যতার এক সুন্দর আবিষ্কার। এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও আজ আমাদের সামনে।
নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচকে কেন্দ্র করে রেফারিং ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন দেখা গেছে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। যুক্তির চেয়ে আবেগ, বিশ্লেষণের চেয়ে পক্ষপাত অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছে আলোচনায়। কেউ রেফারিকে দুষেছেন, কেউ প্রতিপক্ষ সমর্থককে বিদ্রূপ করেছেন, ফুটবলের সৌন্দর্য ভুলে অনেকে ব্যক্তিগত আক্রমণকেই সমর্থনের ভাষা বানিয়েছেন।
এখানেই আমাদের সমাজের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলকে সমর্থন করা অনেক সময় নিছক ফুটবল-সমর্থন নয়; তা সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। এমনও দেখা যায়, কেউ ব্রাজিলকে ভালোবাসেন বলেই আর্জেন্টিনাকে অপছন্দ করেন না, বরং এমন একটি অবস্থান নেন, যাতে তার ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রতিপক্ষের বিপরীতে দাঁড়ানো যায়। এর উল্টো ঘটনাও কম নয়। ফুটবল তখন আনন্দের ভাষা থেকে সরে এসে প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষায় রূপ নেয়। আর যখন সেই প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর প্রতীকী থাকে না, বাস্তবের রাস্তায় নেমে আসে, তখনই ঘটে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনাগুলো।
কুমিল্লায় বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ চলাকালে বাগবিতণ্ডার জেরে আর্জেন্টিনার কয়েকজন সমর্থকের মারধরে প্রাণ হারিয়েছেন শরিফুল ইসলাম নামের এক ব্রাজিল সমর্থক। হবিগঞ্জ ও বগুড়ায় দল নিয়ে বিতর্কের জেরে ঘটেছে সংঘর্ষ, আহত হয়েছেন একাধিক তরুণ। পরিস্থিতি এমন গুরুতর আকার নিয়েছে যে হাইকোর্টে রিট পর্যন্ত দায়ের হয়েছে বিশ্বকাপকেন্দ্রিক প্রাণঘাতী সহিংসতা ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের দাবিতে। গত ৯ জুলাই জাতীয় সংসদে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক নিজেই উদ্বেগের সঙ্গে জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ইতিমধ্যে অন্তত দশজনের প্রাণ গেছে। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার এই উন্মাদনা যেন কেবল আনন্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, কোনোভাবেই যেন তা সহিংসতা বা প্রাণহানির কারণ না হয়। একজন মন্ত্রীকে যখন সংসদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে একটি খেলা নিয়ে সংযমের আহ্বান জানাতে হয়, তখন বুঝতে হয় যে আমাদের আবেগ কতটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
এখানেই দাঁড়ায় সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি। যে জাতি হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দেশকে নিছক ফুটবলের জন্য পাগলের মতো ভালোবাসতে পারে, সেই একই জাতি কী করে জড়িয়ে পড়ে হিংসা, হানাহানি, মারামারি ও কাটাকাটিতে? একটি খেলার ফলাফল নিয়ে মতভেদ কীভাবে রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘাতে, তা যেন আমাদের এই বিপুল ভালোবাসারই এক করুণ, বিপরীত মুখ। অথচ একই সময়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তে এই বিশ্বকাপই মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন তৈরি করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে অভিবাসী জনগোষ্ঠী, সবখানেই ফুটবল মানুষকে একত্র করছে। বিশ্বকাপ আবারও প্রমাণ করছে, খেলাধুলার সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়, মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করা।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশ্নটি থেকে যায় অন্য জায়গায়। যে জাতি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের জয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলতে পারে, প্রিয় দলের জন্য শত ফুট পতাকা তৈরি করতে পারে, একটি গোলের আনন্দে অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরতে পারে, সেই জাতি কেন নিজের সমাজে এত সহজে বিভক্ত হয়ে যায়? কেন রাজনৈতিক মতভেদ, সামাজিক অবস্থান বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে আমরা একে অপরের প্রতি এত নির্মম হয়ে উঠি?
সম্ভবত সমস্যাটি আমাদের আবেগে নয়। সমস্যা হলো, সেই আবেগের দিকনির্দেশনায়। যে আবেগ ফুটবলের মাধ্যমে মানুষকে আনন্দ দিতে পারে, সেই একই আবেগ যদি বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা বা অন্ধ সমর্থনে রূপ নেয়, তাহলে ফুটবল তার সৌন্দর্য হারায়। আর যদি সেই আবেগ মানুষকে আরও সহনশীল, আরও মানবিক করে তোলে, তাহলে ফুটবল কেবল একটি খেলা থাকে না, একটি সভ্যতার শিক্ষা হয়ে ওঠে। হয়তো তাই এই বিশ্বকাপ আমাদের সামনে কেবল একটি প্রশ্নই রাখছে না, একটি আয়নাও তুলে ধরছে। সেই আয়নায় আমরা কেবল মেসি, নেইমার কিংবা বিশ্বকাপের ট্রফিকে দেখি না; দেখি নিজেদেরও।
◆ শিকড়ের গল্প: ম্যারাডোনা থেকে নেইমার
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি এই গভীর সমর্থনের ইতিহাস আসলে শুধু ফুটবলের ইতিহাস নয়; এটি গণমাধ্যম, প্রজন্মের স্মৃতি আর স্বপ্নেরও ইতিহাস। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে যখন বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিস্তার শুরু হয়, তখন বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকারা সরাসরি মানুষের ঘরে পৌঁছাতে থাকেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার অসাধারণ নৈপুণ্য বাংলাদেশের একটি প্রজন্মকে আর্জেন্টিনার সঙ্গে আবেগগতভাবে যুক্ত করে দেয়। অন্যদিকে ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবল, পেলের ঐতিহ্য, ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ জয় আর পরে রোনালদো-রোনালদিনিয়ো-কাকা-নেইমারের মতো তারকারা ব্রাজিলকে বাংলাদেশের লাখো মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন দেয়।
একটি প্রজন্মের ভালোবাসা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উত্তরাধিকার হিসেবে পৌঁছেছে। বাবা যে দলের সমর্থক, সন্তানও প্রায়ই সেই দলের সমর্থক হয়ে ওঠে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ আসলে কেবল একটি দলকে সমর্থন করে না, একটি গল্পকে সমর্থন করে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে তা মারাদোনার সংগ্রাম আর মেসির দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিশ্বজয়ের গল্প; ব্রাজিলের ক্ষেত্রে তা সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা আর আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঐতিহ্য।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ নিজের পরিচয়কে বিভিন্ন প্রতীকের সঙ্গে যুক্ত করতে ভালোবাসে। যেমন- জাতীয় পতাকা, ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা একটি ক্রীড়া দল, সবই হতে পারে আত্মপরিচয়ের অংশ। প্রিয় দলের সাফল্যে তাই সমর্থক ব্যক্তিগত আনন্দ অনুভব করেন, মনে হয় যেন নিজের জীবনেরই একটি অংশ সফল হয়েছে। এই অনুভূতি স্বাভাবিক, মানবিক। সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন নিজের পরিচয়কে শক্তিশালী করতে গিয়ে অন্যের পরিচয়কে অপমান করা শুরু হয়।
◆ যখন বাণিজ্য মাঠ দখল করে
আধুনিক ফুটবলও বদলে গেছে এমনভাবে যে দর্শকের আবেগ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় সম্পদ। একসময় ফুটবল ছিল মূলত মাঠের খেলা, এখন তা বিশ্বের অন্যতম বড় বিনোদন শিল্প। একটি বিশ্বকাপ ঘিরে সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, জার্সি বিক্রি ও ডিজিটাল কনটেন্টে যে বিপুল অর্থের লেনদেন হয়, তাতে ফিফা বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থাকে না, হয়ে ওঠে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ইভেন্ট। ফুটবলাররাও এই অর্থনীতির কেন্দ্রে। মেসি, নেইমার কিংবা অন্য বিশ্বতারকারা শুধু মাঠের খেলোয়াড় নন, তারা একেকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড; যাদের নাম-ছবি-জীবনধারা কোটি মানুষের ভোক্তা-আচরণ প্রভাবিত করে।
একজন সাধারণ দর্শক মনে করেন, তিনি কেবল নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করছেন, অথচ সেই ভালোবাসার চারপাশে কাজ করছে একটি বিশাল বাণিজ্যিক কাঠামো। এতে সমস্যা নেই, কারণ পেশাদার খেলাধুলা চালাতে অর্থ লাগে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন বাণিজ্যিক স্বার্থ খেলাধুলার মানবিক মূল্যবোধকে ছাপিয়ে যায়; বড় টুর্নামেন্টে জনপ্রিয় তারকা বা দলকে ঘিরে পক্ষপাতিত্বের যে অভিযোগ মাঝেমধ্যে ওঠে, তা এই উদ্বেগেরই প্রতিফলন, যদিও তাকে প্রমাণিত সত্য নয়, আলোচিত বিতর্ক হিসেবেই দেখা উচিত।
বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য এই বিষয়টি বোঝা জরুরি। কারণ, আবেগ আমাদের শক্তি। এই আবেগই মানুষকে একত্র করতে পারে, আবার অচেতন আবেগ মানুষকে বিভক্তও করতে পারে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের এই বিপুল আবেগ যে বিশ্ব ফুটবল-বাণিজ্যের জন্য কতটা বড় একটি বাজার, তা নিয়ে আমাদের ভাবনায় এখনো বিস্তর ঘাটতি। কোটি টাকার জার্সি বিক্রি, স্যাটেলাইট চ্যানেলের সম্প্রচার স্বত্ব, ইন্টারনেট ডেটা প্যাকেজ, বিজ্ঞাপনদাতাদের পণ্য প্রচার। এসবের পেছনে বাংলাদেশের মতো দেশের কোটি কোটি আবেগপ্রবণ দর্শকই সবচেয়ে বড় ভোক্তা। আমরা কবে বুঝব যে আমাদের এই ভালোবাসা আসলে একটি পণ্য, যা বিক্রি হচ্ছে আমাদেরই কাছে, আমাদেরই টাকায়?
একটি জার্সি কেনা মানেই কেবল প্রিয় তারকার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ নয়; তা একটি বহুজাতিক বাণিজ্যিক চক্রের অংশ হয়ে ওঠা। পাইরেটেড জার্সি থেকে অরিজিনাল জার্সি, শত ফুট পতাকা তৈরির খরচ, রাত জেগে খেলা দেখতে বাড়তি মোবাইল ডেটা কেনা; প্রতিটি ব্যয়ের পেছনে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সামর্থ্যের একটি বড় অংশ চলে যায়, অথচ তার সুফল ফিরে আসে না আমাদের অর্থনীতিতে, ফিরে আসে না আমাদের নিজেদের ফুটবলেও।
ফিফা, স্পনসর প্রতিষ্ঠান আর সম্প্রচারকারী চ্যানেলগুলোর কাছে বাংলাদেশের এই আবেগ একরকম সোনার খনি। কিন্তু যতদিন আমরা এই সত্যটি উপলব্ধি না করব, ততদিন আমরা কেবল ভোক্তাই থেকে যাব, সচেতন সমর্থক হয়ে উঠতে পারব না। সচেতন সমর্থক হওয়ার অর্থ ভালোবাসা বন্ধ করা নয়; বরং বোঝা, কোথায় আমাদের এই আবেগ ন্যায্যভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে, আর কোথায় তা কেবল অন্যের মুনাফার হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
◆ দ্রগবার হাঁটু গেড়ে বসা এক আবেদন
যে খেলা কখনো কখনো মানুষের মধ্যে উত্তেজনা ও বিভাজন তৈরি করে, সেই খেলাই আবার যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজে শান্তির ভাষা হয়ে উঠেছে। ইতিহাস তার বহু প্রমাণ বহন করে। সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ আইভরি কোস্টের ফুটবলার দিদিয়ের দ্রগবা। ২০০২ সাল থেকে দেশটি বিভক্ত হয়ে পড়েছিল রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে। ২০০৫ সালে সুদানের বিপক্ষে জয়ের পর বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার সেই মুহূর্তে মাঠেই ক্যামেরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেন দ্রগবা ও তার সতীর্থরা। তিনি জাতির উদ্দেশে শান্তির আকুল আহ্বান জানান অস্ত্র নামিয়ে রাখার, বিভক্ত জাতিকে এক হয়ে ওঠার। তিনি তখন আর কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না; কথা বলেছিলেন একজন নাগরিক হিসেবে, একজন মানুষের মতো।
সেই আহ্বান দেশজুড়ে টেলিভিশন-রেডিওতে বারবার প্রচারিত হয়, আর অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার ও বিদ্রোহীরা বাধ্য হয় আলোচনার টেবিলে বসতে। পরবর্তীতে আইভরি কোস্টে ফুটবল শান্তি প্রক্রিয়ার একটি প্রতীকী শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একটি দেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধান একটি খেলা একা করতে পারে না ঠিকই কিন্তু ফুটবল মানুষের মধ্যে যে আবেগ ও সংযোগ তৈরি করে, তা শান্তির পথকে সহজ করে দিতে পারে। এটাই খেলাধুলার প্রকৃত দর্শন-প্রতিযোগিতা করতে শেখানো, ঘৃণা করতে নয়; প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে শেখানো, অপমান করতে নয়।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে দ্রগবার এই দৃষ্টান্ত থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়েও প্রতিবেশীর সঙ্গে সহাবস্থান করা যায়; প্রতিদ্বন্দ্বিতা রেখেও এড়ানো যায় রক্তপাত।
◆ প্রশ্নটি থেকে যায়
আমরা যারা দর্শক, আমরা কি সেই আবেগকে বুঝে ব্যবহার করছি? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা এমন একটি জাতি, যারা আবেগ দিয়ে ভালোবাসতে জানি। ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছি, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অসংখ্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছি। আমাদের আবেগের শক্তি কখনো কখনো অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে, সেই একই আবেগ আমরা নিজেদের সমাজের জন্য কতটা ব্যবহার করছি?যে তরুণ আর্জেন্টিনার জন্য রাত জেগে খেলা দেখে, সে কি একই আগ্রহে নিজের এলাকার দরিদ্র শিশুটির শিক্ষার কথা ভাবে?যে মানুষ ব্রাজিলের জয়ে আনন্দ মিছিল করে, সে কি একই উৎসাহে অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ায়? যে মানুষ শত ফুট পতাকা বানাতে অর্থ ব্যয় করে, সে কি কখনো সমাজের কোনো ইতিবাচক কাজে একই উদারতা দেখিয়েছে?
এই প্রশ্নগুলো ফুটবলের বিরুদ্ধে নয়। ফুটবলের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা থেকেই এই প্রশ্ন করা। কারণ, ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, তা মানুষকে আরও ভালো মানুষ করে তোলে।
বিশ্বকাপ হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই সহজে শেষ হয়ে যাবে। ট্রফি উঠবে কোনো একটি দলের হাতে, রাস্তার উৎসব থেমে যাবে, পতাকাগুলো একে একে নেমে আসবে দেয়াল থেকে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই যে বিপুল আবেগ আমরা এত দিন প্রত্যক্ষ করলাম, তা কি আগামী দিনগুলোয় নিজের দেশ ও জাতিকে ভালোবাসার কাজে লাগানো যাবে? নাকি বিশ্বকাপের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এই আবেগও নিভে যাবে, আবার অপেক্ষা করতে হবে পরের বিশ্বকাপ না আসা পর্যন্ত?
মেসি কিংবা নেইমারকে যারা এত গভীরভাবে ভালোবাসেন, তাদেরই আশপাশের মানুষকে, নিজের প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা ভিন্নমতের স্বদেশীকে আমরা কেন একই রকম ভালোবাসতে পারি না? একবার কি ভেবে দেখেছি, অপরকে সহ্য করার, ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়ার সহনশীলতা আমাদের মধ্যে আসলে কতটুকু বিদ্যমান? দূরের একজন বিদেশি তারকাকে ভালোবাসা সহজ, কারণ তাতে ব্যক্তিগত মতের কোনো সংঘাত নেই, নেই কোনো দায়। কিন্তু কাছের মানুষকে সহ্য করা, তার ভিন্নতাকে মেনে নেওয়া; সেখানেই আসল পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষায় আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।
আমরা যদি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি আমাদের ভালোবাসাকে সৌহার্দ্য ও মানবিকতার শক্তিতে রূপান্তর করতে পারি, তাহলে এই আবেগ বাংলাদেশের জন্য এক অসাধারণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। ফুটবল তখন কেবল রাত জেগে খেলা দেখার বিষয় থাকবে না, হয়ে উঠবে সামাজিক পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বকাপের ট্রফি একদিন একজনের হাতে যাবে, কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ থেকে যাবে আমাদের সবার হাতেই। মেসি, নেইমার বা অন্য কোনো বিশ্বতারকা আমাদের জীবনের সমস্যার সমাধান করবেন না। আমাদের সমাজকে সুন্দর করবে আমাদের নিজেদের আচরণ, পারস্পরিক সম্মান ও মানবিকতা। তাই আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলকে ভালোবাসুন, ফুটবল উপভোগ করুন, প্রিয় দলের জয়ে আনন্দ করুন, পরাজয়ে কষ্ট পান; এটি মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন কখনো ঘৃণায় পরিণত না হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কখনো শত্রুতায় পরিণত না হয়। একটি খেলার কারণে যেন কোনো বন্ধুত্ব নষ্ট না হয়, কোনো মানুষের প্রাণ না যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই মাঠের খেলোয়াড়। আমাদের পতাকা আলাদা হতে পারে, পছন্দের দল আলাদা হতে পারে, মতামত আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমাদের মানবিক পরিচয় এক।
আজ যখন বাংলাদেশের আকাশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা উড়ছে, তখন সেই পতাকার সঙ্গে যদি আমরা মানবতার পতাকাটিও উড়াতে পারি, সেটিই হবে প্রকৃত বিজয়। হয়তো তখন মোশাররফ করিমের সেই জনপ্রিয় সংলাপটি নতুন অর্থ পাবে। আমার এত আবেগ ক্যারে?
উত্তর হবে- কারণ আমরা ভালোবাসতে জানি। আর সেই ভালোবাসা যদি নিজের মানুষ, নিজের সমাজ ও মানবতার জন্য ব্যবহার করতে পারি, তবে সেই আবেগই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী, গবেষক ও পর্যবেক্ষক; প্যারিস, ফ্রান্স