রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

‘জাতির সঙ্গে বেইমানি করব না, গণভোট বাস্তবায়নে বাধ্য করব’

বক্তব্য রাখছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি : কালবেলা
বক্তব্য রাখছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি : কালবেলা

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবি থেকে ১১ দলীয় জোট এক চুলও সরে আসবে না বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘এ দাবিতে নানা ধরনের চাপ থাকলেও জাতির সঙ্গে বেইমানি করব না। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে।’

শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে রংপুর নগরীর জিলা স্কুল মাঠে ১১ দলের উদ্যোগে আয়োজিত বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধ এবং উত্তরাঞ্চলের জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আজকে আপনাদের কথা দিচ্ছি, আমাদের বিভিন্নভাবে এ গণভোট বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক কথা বলা হচ্ছে। পরিষ্কার কথা, আমরা জাতির সঙ্গে বেইমানি করতে পারব না। জাতিকে আমরা কথা দিয়েছি। লড়াই আমরা করে যাব। গণভোট বাস্তবায়নে বাধ্য করব, ইনশাআল্লাহ। এর থেকে এক চুল পরিমাণও সরব না। এ আবু সাইদের রক্তে ভেজা রংপুরে আরেকবার এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করে গেলাম।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বৈষম্যমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই দেশের আমাদের সন্তানেরা আন্দোলন করেছিলেন। সেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্যই সংস্কারের উদ্দেশ্যে গণভোট হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একসময় বলেছিলেন, দুটি ভোট দেবেন—একটি তার দলকে, আরেকটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট। তিনি প্রথম প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয়টি রক্ষা করেননি।”

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে তিস্তার বালুচরে ‘কোদাল মেরে’ প্রথমেই বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রা শুরু করব। নির্বাচনের আগে তিস্তা নিয়ে আন্দোলন করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও চলতি বাজেটে এ প্রকল্পের জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।”

তিনি বলেন, ‘আমরা আর কথার ফুলঝুরি শুনতে চাই না। আমরা বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই। এ সরকার যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১১ দলের সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। তিস্তার ব্যাপারে কোনো ধানাই-পানাই চলবে না।’

রংপুরকে কৃষির রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কথাও তুলে ধরেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘শুধু ঘোষণা দিয়ে কৃষির রাজধানী গড়ে তোলা সম্ভব নয়; এ জন্য মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। এ অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত আলু হিমাগারে সংরক্ষণে প্রতি বস্তায় ৬০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। এটি জুলুম। কৃষকদের জন্য ন্যায্য খরচে সংরক্ষণের ব্যবস্থা এবং সব কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।’

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম অস্থির হয়ে পড়ছেন। সরকারের হৃদয়ে এগুলো ঢোকে না কারণ জনগণ তো চাঁদাবাজি করে না। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা তাদের দুঃখ বুঝতে পারবে না।’

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘সব দুর্নীতিবাজরা এক হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের হারিয়ে দিয়েছে কয়বার। ঘুঘু তুমি ধান খাও বারবার, ধরা পড়বা একবার। আগামীতে এ সুযোগ আর দেবে না জনগণ। তখন ন্যায় ইনসাফের ভিত্তির উপরে এগারো দল একটি সরকার গঠন করবে। যে দেশে চাঁদাবাজ তো দূরের কথা, তাদের ছায়াও সহ্য করা হবে না। দুর্নীতি করার প্রয়োজন কারও হবে না। সম্মানজনকভাবে সবাই বাঁচতে পারবে। কেউ দুর্নীতি করলে তাকে ছেড়ে কথা বলা হবে না। প্রধানমন্ত্রী হলেও না। তাকেও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।’

সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বিস্তীর্ণ সীমান্তে প্রতিবেশী ভারতের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও সরকার এ বিষয়ে নীরব। সরকার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। আমরা প্রতিবাদ করছি, জনগণ প্রতিবাদ করছে। শুধু প্রতিবাদই করছে না, প্রতিরোধ করার জন্য বিজিবির সৈনিকদের সঙ্গে সমান তালে জনগণ লড়াই করে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের মুখ থেকে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত একটা শব্দও আসে নাই। কার ভয়ে, কাকে খুশির জন্য? কোন দেশের শাসক আপনারা? বাংলাদেশের জনগণের নাড়ির পালস বোঝার চেষ্টা করুন। জনগণের অভিপ্রায় আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে করে অবস্থান নেবেন না। নিলে কী হয়, সম্প্রতি ইতিহাস থেকে সবারই সবক গ্রহণ করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যতদিন বেঁচে থাকব, দেশের এক ইঞ্চি জমি তো দূরের কথা, একটা বালুর উপরেও কাউকে কর্তৃত্ব করতে দেবো না। যারা হুমকি-ধমকি দিচ্ছে তাদের বলি, আপনারা এভাবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করবেন না। এ দেশে জন্ম নেওয়া প্রত্যেকটা নারী-পুরুষই আমাদের সৈনিক। জুলাইয়ে এটার প্রমাণ রেখেছে সবাই। মায়েরা রেখেছে, বোনেরা রেখেছে, মেয়েরা রেখেছে, ভাইয়েরা রেখেছে, সন্তানেরা রেখেছে এবং বয়স্করাসহ কোলের শিশুও রেখেছে।’

ছাত্র-জনতার হত্যায় জড়িত পুলিশের বিচার বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘হত্যাকারী পুলিশদের বিচার গুলিয়ে দেওয়ার জন্য একদল উঠেপড়ে লেগেছে। আমরা পুলিশের সব সদস্যকে বলছি না যে তারা অপরাধী। কিন্তু যারা অপরাধ করেছে, যারা অবলীলায় মানুষ খুন করেছে, তাদের বিচার আপনারা চান না? সে পুলিশ হোক আর সাধারণ মানুষ হোক, তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে।’

জুলাই আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘শুধু জুলাই নয়, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু করে তারা যে খুনের রাজনীতির সূত্রপাত করেছিল, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলায় হেফাজতের লোকদের হত্যা, তারপর সারা দেশে সাড়ে পনেরো বছর গুম-খুনের রাজনীতি। জুলাইয়ে এসে মহা হত্যাজজ্ঞ, গণহত্যা যারা চালিয়েছে, একেবারে সেই বিপ্লবের প্রতীক শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সব বিচার করতে হবে। যদি এ সরকারের সেই বিচার করার সাহস না থাকে, তাহলে নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে বিদায় নেন। পরবর্তী সরকার এসে সেই বিচার করবে।’

বক্তব্যের শেষদিকে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাথা নত করব না। আমরা বীরের জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে দাঁড়াব। কোনো আধিপত্যবাদের কাছে আমরা নতি স্বীকার করব না। আবু সাঈদ এবং আবু সাঈদের বন্ধুরা, তোমাদের আত্মার কাছে আমরা অঙ্গীকার করছি আরেকবার, আমরা বৈশ্বিক মহীন বাংলাদেশ গড়ব ইনশাআল্লাহ। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের কবর দেওয়া হবে।’

বিরোধীদলীয় হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ ও স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভাঙ্গায় সন্ধ্যা থেকে সড়ক অবরোধ, দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি

স্বাস্থ্যের পরিচালককে নিয়ে বরিশাল ড্যাবের প্রকাশ্যে গ্রুপিং, স্বাস্থ্য বিভাগে অস্থিরতা 

এক ঘণ্টায় হাজারো রুটি, কেরানীগঞ্জ কারাগারে অত্যাধুনিক মেশিনের চমক

আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার আন্তোনিও রাট্টিন মারা গেছেন

ছোট ছোট ভুল অভ্যাসই বাড়াচ্ছে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি: ড. মজিবুল হক

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার জমির উদ্দিন অসুস্থ, খোঁজ নিলেন ডেপুটি স্পিকার

বেদনার আকাশ

বন্যায় চট্টগ্রামে মাছের ক্ষতি শত কোটি টাকা

গুলশানে বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটি

রোববার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা স্থগিত, ক্লাস চলবে

১০

প্রবাস ফেরত হাবিব ক্যানসার থেকে বাঁচতে চান

১১

মেসির দুই মিসের পর আর্জেন্টিনার পেনাল্টি নেবেন কে?

১২

এআই নিয়ে গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে: আইসিটি মন্ত্রী

১৩

পদ্মায় ধরা পড়ল ৪০ কেজির বিশাল কাতলা

১৪

মাদকসহ দুই যুবক আটক, বাঁশে ঝুলিয়ে পুলিশে দিলো গ্রামবাসী

১৫

র‌্যাঙ্কিংয়ে পেছাল আর্জেন্টিনা, বিদায় নিলেও সুখবর মিলল ব্রাজিল সমর্থকদের

১৬

সাইরেন বাজার আগেই ইউক্রেনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, বহু হতাহত

১৭

বন্যাদুর্গতদের চিকিৎসাসেবায় ছাত্রদলের মেডিকেল টিম গঠন

১৮

ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মোশারফ, অর্থ-সম্পাদক আলাউদ্দিন

১৯

আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড লাইভ ম্যাচ, মোবাইলে দেখবেন যেভাবে

২০
X