

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে প্রতি বছরই মুমিনের দুয়ারে হাজির হয় পবিত্র রমজান মাস। আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময় এই মাহে রমজান। মহিমান্বিত মাসটিতে ভোরের সাহরি থেকে সন্ধ্যার ইফতার, দিনের রোজা থেকে রাতের তারাবিহ—প্রতিটি ইবাদতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দোয়া ও ইসতেগফার। কারণ রমজান শুধু উপবাসের মাস নয়, এটি দোয়া কবুলের মাস, গোনাহ মাফের মাস এবং আল্লাহর রহমত লাভের সুবর্ণ সুযোগ।
এ মাসে বান্দা যত বেশি আল্লাহর দরবারে হাত তোলে, ততই সে নৈকট্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করে। তাই রমজানজুড়ে রোজার নিয়ত, ইফতারের দোয়া, তারাবিহ নামাজের দোয়া, মুনাজাত ও ইসতেগফার—এসব দোয়া নিয়মিত পাঠে অভ্যস্ত হন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। কালবেলার পাঠকদের জন্য এখানে বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ রমজান মাসে বেশি পঠিত গুরুত্বপূর্ণ দোয়াগুলো তুলে ধরা হলো।
রোজার নিয়ত-প্রচলিত দোয়া
রমজানের রোজা শুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়ত করা করা ফরজ। হ্যাঁ, নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরী নয়, তবে উত্তম। আমাদের দেশে রোজার একটি আরবি নিয়ত প্রসিদ্ধ— যেটা মানুষ মুখে পড়ে থাকেন। তবে এটি সরাসরি কোনো হাদিসে বর্ণিত হয়নি। কেউ চাইলে পড়তে পারেন (জেনে রাখা উচিত যে, নিয়ত পড়ার চেয়ে নিয়ত করা গুরুত্বপূর্ণ)।
প্রচলিত আরবি নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمْضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضَا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّل مِنِّى اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْم
বাংলা উচ্চারণ : নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমজানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।
অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে (আমার রোজা তথা পানাহার থেকে বিরত থাকাকে) কবুল করো, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।
ইফতারের দোয়া
بسم الله اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ
বাংলা উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিজক্বিকা ওয়া আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।
অর্থ : হে আল্লাহ, আমি তোমারই সন্তুষ্টির জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেয়া রিজিজের মাধ্যমে ইফতার করছি।
হজরত মুয়াজ ইবনে যুহরাহ (রা.) আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইফতার করতেন, তখন উল্লিখিত দোয়াটি পড়তেন। (আবু দাউদ : ২৩৫৮)
ইফতারের পরের দোয়া
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) যখন ইফতার করতেন, তখন বলতেন-
ذَهَبَ الظَّمَاءُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ وَ ثَبَتَ الْأَجْرُ اِنْ شَاءَ اللهُ
বাংলা উচ্চারণ : জাহাবাজ জামাউ; ওয়াবতাল্লাতিল উ’রুকু; ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
অর্থ : ‘(ইফতারের মাধ্যমে) পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপসিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান সাওয়াবও স্থির হলো।’ (আবু দাউদ : ২৩৫৭)
তারাবি নামাজের দোয়া
তারাবি নামাজে প্রতি চার রাকাত পর বিশ্রাম নেওয়া হয়। এ সময় একটি দোয়া পড়ার প্রচলন রয়েছে আমাদের দেশে। প্রায় সব মসজিদের মুসল্লিরা এই দোয়াটি পড়ে থাকেন। দোয়াটি হলো,
سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظْمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوْتِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِيْ لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوْتُ اَبَدًا اَبَدَ سُبُّوْحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّنا وَرَبُّ المْلائِكَةِ وَالرُّوْحِ
বাংলা উচ্চারণ : সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা জিল ইজ্জাতি ওয়াল আজমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিব্রিয়ায়ি ওয়াল জাবারুতি। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামুত আবাদান আবাদ; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ।
রাজধানীর জামিয়া ইকরার ফাজিল মুফতি ইয়াহইয়া শহিদ কালবেলাকে বলেন, তারাবি নামাজ বিশুদ্ধ হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে এই দোয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। এই দোয়া না পড়লে তারাবি নামাজ হবে না, কোনওভাবেই এমন মনে করা যাবে না।
তিনি বলেন, এ সময় কোরআন-হাদিসে বর্ণিত যেকোনো দোয়াই পড়া যাবে। আলেমদের মতে, তারাবি নামাজে চার রাকাত পর বিশ্রামের সময়টিতে কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া, তওবা,-ইসতেগফারগুলো পড়াই উত্তম।
শবে কদরের দোয়া
হজরত আয়শা (রা.) হতে বর্ণিত, ‘‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, যদি আমি লাইলাতুল কদর জানতে পারি তাহলে সে রাতে কী বলব? তিনি বললেন, তুমি বলো, ‘‘হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’’
দোয়াটির আরবি
اللَّهمَّ إنَّك عفُوٌّ كريمٌ تُحِبُّ العفْوَ، فاعْفُ عنِّي
বাংলা উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন কারিম; তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি।
অর্থ : হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’ (তিরমিজি : ৩৫১৩)
রহমতের ১০ দিনের দোয়া
রমজানের প্রথম ১০ দিন যেহেতু রহমত নাজিল হয়, তাই এ সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি রহমত কামনা করে দোয়া করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোরআনে বর্ণিত নিচের দোয়া দুটি বেশি বেশি পড়া যেতে পারে।
এক. وَقُل رَّبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
বাংলা উচ্চারণ : ওয়াক্বুর রব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খাইরুর রা-হিমিন।
অর্থ : আর বলুন, হে আমার রব! ক্ষমা করুন ও দয়া করুন, আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সুরা মুমিনুন : ১১৮)
দুই. رَبَّنَاۤ اٰتِنَا مِنۡ لَّدُنۡکَ رَحۡمَۃً وَّ هَیِّیٴۡ لَنَا مِنۡ اَمۡرِنَا رَشَدًا
উচ্চারণ : রব্বানা আ-তিনা মিল্লাদুনকা রহমাহ, ওয়াহায়্যি’লানা মিন আমরিনা রাশাদা।
অর্থ : হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাদের অনুগ্রহ দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকর্ম সঠিকভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন।’ (সুরা কাহফ : ১০)
মাগফিরাতের দশকের দোয়া
মাগফেরাতের দশকে বেশি বেশি মাগফেরাতের দোয়া করা উচিত হবে। এ ক্ষেত্রে কোরআনে বর্ণিত কিছু দোয়া বেশি বেশি পাঠ করতে পারেন। নিচে সেগুলো তুলে ধরা হলো।
এক. رَبِّ اِنِّیۡ ظَلَمۡتُ نَفۡسِیۡ فَاغۡفِرۡ لِیۡ
বাংলা উচ্চারণ : রাব্বি ইন্নি জালামতু নাফসি ফাগফিরলি।
অর্থ : হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নফসের প্রতি জুলুম করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। (সুরা কাসাস : ১৬)
দুই. اَنۡتَ وَلِیُّنَا فَاغۡفِرۡ لَنَا وَ ارۡحَمۡنَا وَ اَنۡتَ خَیۡرُ الۡغٰفِرِیۡنَ
আনতা ওয়ালিয়্যুনা- ফাগফিরলানা- ওয়ারহামনা- ওয়া আনতা খাইরুল গা-ফিরিন।
অর্থ : আপনি আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদের ক্ষমা করে দিন এবং আপনি উত্তম ক্ষমাশীল। (সুরা আরাফ : ১৫৫)
তিন . سَمِعۡنَا وَ اَطَعۡنَا غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَ اِلَیۡكَ الۡمَصِیۡرُ
বাংলা উচ্চারণ : সামি‘না- ওয়া আত্বা‘না- গুফরা-নাকা রাব্বানা- ওয়া ইলাইকাল মাসির।
অর্থ : আমরা শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনারই (নিকট) ক্ষমা প্রার্থনা করি, আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল। (সুরা বাকারা : ২৮৫)
নাজাতের ১০ দিনের দোয়া
নাজাতের দশকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য বেশি দোয়া দোয়া করা উচিত। এ ক্ষেত্রে নিচের দোয়াগুলো করা যেতে পারে।
এক. رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
বাংলা উচ্চারণ : রাব্বানা আতিনা ফিদদুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া ক্বিনা আজাবান নার। (সুরা বাকারা : ২০১)
দুই. رَبَّنَا اغْفِرْ لِيْ وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِيْنَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابُ
বাংলা উচ্চারণ : রাব্বানাগফিরলি ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিলমুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।
অর্থ : হে আমাদের প্রভু, যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন তুমি আমাকে, আমার বাবা-মাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করো। (সুরা ইবরাহিম : ৪১)
অর্থ : হে পরওয়ারদেগার, আমাদিগকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করো। আর আমাদেরকে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা করো।
তিন. رَبَّنَا وَلاَ تُحَمِّلْنَا مَا لاَ طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلاَنَا
বাংলা উচ্চারণ : রাব্বানা ওয়ালা তুহাম্মিলনা মা-লা তোয়াক্বাতা লানা বিহি, ওয়া’ফু আন্না ওয়াগফিরলানা ওয়ারহামনা আংতা মাওলানা ফাংছুরনা আলাল ক্বাওমিল কাফিরিন।
অর্থ : হে আমাদের রব, যে বোঝা বহন করার সাধ্য আমাদের নেই, সে বোঝা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিও না। আমাদের পাপ মোচন করুন। আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি দয়া করুন। তুমিই আমাদের প্রভু। (সুরা বাকারাহ : ২৮৬)
উল্লিখিত দোয়াগুলো ছাড়া আরও অসংখ্য দোয়া রয়েছে, সেগুলোও করতে পারবেন।
মন্তব্য করুন