

ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা এবং সামাজিক সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান দিয়ে থাকে। এরই অংশ হিসেবে ইসলামে বিশেষ প্রেক্ষাপটে পুরুষকে একাধিক বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে এই অনুমতি কেবল ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি; বরং একে কঠিন দায়িত্ব, ন্যায়বিচার ও তাকওয়ার সুদৃঢ় ফ্রেমে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে (নারী) এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে নারীদের মধ্য হতে নিজেদের পছন্দমতো দুই-দুই, তিন-তিন ও চার-চারজনকে বিয়ে করো, কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে তোমরা সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকে কিংবা তোমাদের অধীনস্থ দাসীকে; এটাই হবে অবিচার না করার কাছাকাছি।’ (সুরা নিসা: ৩)
রাজধানীর জামিয়াতুল ইসলামিয়া বায়তুস সালামের (মিরপুর-১২) সিনিয়র মুফতি আব্দুর রহমান হোসাইনী কালবেলাকে বলেন, উল্লিখিত আয়াতটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইসলামের দৃষ্টিতে একাধিক বিয়ে জায়েজ। তবে একই আয়াতে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো, ‘আদল’ তথা ন্যায়বিচার।
অতএব বোঝা গেল একাধিক বিয়ে কোনো বাধ্যতামূলক ইবাদত নয়; বরং প্রয়োজন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে অনুমোদিত একটি ব্যবস্থা। মানুষের অবস্থা বিবেচনায় এটি কারো জন্য মুস্তাহাব, কারো জন্য মুবাহ, কারো জন্য মাকরুহ, আবার কারো জন্য হারামও হতে পারে।
সুরা নিসায় বর্ণিত আয়াতের আলোকে একাধিক বিয়ের জন্য ইসলামের বেঁধে দেওয়া শর্তগুলো তুলে ধরা হলো—
ন্যায়বিচার : কোরআন একাধিক বিয়ের অনুমতির সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়বিচারের শর্ত আরোপ করেছে।
মহানবী (সা.) স্ত্রীদের মাঝে সমতা বজায় রাখতেন। হাদিস শরিফে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের মধ্যে ইনসাফভিত্তিক বণ্টন করে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! এটা আমার পক্ষ থেকে ইনসাফ, যেটুকু আমার সম্ভব হয়েছে। আর যা আপনার নিয়ন্ত্রণে এবং আমার সাধ্যের বাইরে, সে জন্য আমাকে অভিযুক্ত করবেন না।’ (আবু দাউদ : ২১৩৪)
মুফতি আব্দুর রহমান বলেন, কিছু জিনিস মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন। কিন্তু যেগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলো ইনসাফ বজায় রাখা অপরিহার্য। যে কয়েকটি ক্ষেত্রে ইনসাফ রক্ষা করা অপরিহার্য সেগুলো হলো—
১. ভরণপোষণে সমতা : প্রত্যেক স্ত্রীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় খরচ যথাসম্ভব সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
২. সময় বণ্টনে ইনসাফ : স্ত্রীদের সঙ্গে অবস্থান ও সময় কাটানোর ক্ষেত্রে বৈষম্য করা যাবে না। রাসুল (সা.) নিজ স্ত্রীর মধ্যে পালাক্রমে সময় বণ্টন করতেন।
৩. আচরণ ও ব্যবহারে ভারসাম্য : একজনের সামনে আরেকজনকে অপমান করা, অবহেলা করা বা মানসিক কষ্ট দেওয়া জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। যার চিহ্ন কঠিন কিয়ামতের দিনও ফুটে উঠবে।
হাদিস শরিফে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুজন স্ত্রী থাকাবস্থায় তাদের একজনের প্রতি ঝুঁকে পড়ল, কেয়ামতের দিন সে পঙ্গু অবস্থায় উপস্থিত হবে। (আবু দাউদ: ২১৩৩)
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামে একাধিক বিয়ের বিধান মূলত একটি সামাজিক ও ব্যক্তিগত ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যম। এটি কোনো যথেচ্ছাচারের সুযোগ নয়, বরং বিশেষ প্রয়োজনে দায়বদ্ধতার এক সুশৃঙ্খল পথ। ইনসাফ এবং তাকওয়া নিশ্চিত করতে না পারলে একটি বিবাহেই সীমাবদ্ধ থাকার জন্য ইসলাম কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। মূলত ইনসাফই হলো এই ব্যবস্থার রক্ষাকবচ।