কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
আল জাজিরার বিশ্লেষণ

রাশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তি আফগানিস্তানের জন্য কতটা মঙ্গলজনক

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও আফগান রাষ্ট্রদূত গুল হাসান হাসান। ছবি : সংগৃহীত
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও আফগান রাষ্ট্রদূত গুল হাসান হাসান। ছবি : সংগৃহীত

গত ২৭ মে তালেবান সরকার ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আফগানিস্তানকে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। চুক্তির বিষয়বস্তু এখনও প্রকাশ করা না হলেও এটি আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এমন একটি সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি, যার বিস্তৃত জনসমর্থন ও আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই, তার গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই সীমাবদ্ধ থাকে।

তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৌশলগত পর্যায়ে এই সমঝোতা আফগানিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে কতটা এগিয়ে নেবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বরং এটি দেশটিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতার আরও গভীরে টেনে নিতে পারে।

প্রত্যেক সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা গড়ে তোলার অধিকার রয়েছে। তবে আফগানিস্তানের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিশেষ সতর্কতা দাবি করে। বড় শক্তিগুলো সাধারণত আফগানিস্তানের স্বার্থ রক্ষার জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্বে জড়ায় না; তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।

বর্তমানে রাশিয়া এমন অবস্থানে নেই যে আফগানিস্তানকে একটি প্রকৃত কৌশলগত অংশীদারিত্বের উপযোগী অর্থনৈতিক, সামরিক বা রাজনৈতিক সহায়তা দিতে পারবে।

এ অবস্থায় মৌলিক প্রশ্ন হলো যদি রাশিয়াকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে এর পেছনে কী ধরনের সুযোগ বা হুমকি কাজ করছে?

রাশিয়া ও তালেবানের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার পেছনে গভীর কৌশলগত লক্ষ্য নয়, বরং তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিবেচনাই বেশি কার্যকর বলে মনে হচ্ছে।

রাশিয়া এবং অনেকাংশে চীনের জন্য আফগানিস্তানে প্রধান উদ্বেগ হলো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো যেন আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে না পারে এবং মাদক পাচার যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।

এর বাইরে আফগানিস্তানে এমন কোনো বড় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বর্তমানে নেই, যা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অঙ্গীকারকে যৌক্তিক করে তুলতে পারে।

সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পর এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ধারাবাহিক আফগান সরকারগুলোর প্রতি উল্লেখযোগ্য সামরিক বা অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়নি। বর্তমানেও এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে মস্কো এখন আফগানিস্তানের অর্থনীতি বা নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনার মতো সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষ এবং আফগান ভূখণ্ডে হামলার ঘটনা দেশটির সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

একই সময়ে আফগানিস্তানের সামরিক সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সাবেক আফগান সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই ছিল মার্কিন ও রুশ প্রযুক্তির মিশ্রণ। যুক্তরাষ্ট্র এসব সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ বা খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়। ফলে মার্কিন অস্ত্র ব্যবস্থার বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে।

এছাড়া অবশিষ্ট সোভিয়েত বা রুশ প্রযুক্তির অস্ত্রের বেশিরভাগই পুরোনো অথবা কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এই বাস্তবতায় রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সমঝোতা বড় ধরনের সামরিক সহায়তায় রূপ নেবে; এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।

বাস্তবে এই চুক্তি সীমিত সুবিধা দিলেও আফগানিস্তানকে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

আফগানিস্তানের পক্ষে এমন দেশগুলোর সঙ্গে সমান কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা বাস্তবসম্মত নয়, যাদের স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িত।

ভারত ও পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইউক্রেন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইরানের সঙ্গে একই ধরনের কৌশলগত বোঝাপড়া একসঙ্গে বজায় রাখার ধারণা বাস্তবে খুবই কঠিন। একটি তুলনামূলক দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুবিধাভোগী হওয়ার পরিবর্তে বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার শিকার হয়ে উঠতে পারে।

তালেবান হয়তো রাশিয়ার সঙ্গে এমন সমঝোতাকে নিজেদের আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করার উপায় হিসেবে দেখছে। কিন্তু এতে তাদের মূল সংকট বৈধতার প্রশ্ন সমাধান হবে না।

কারণ, আন্তর্জাতিক বৈধতার ভিত্তি হলো অভ্যন্তরীণ বৈধতা। যেসব সরকারের বিস্তৃত জনসমর্থন, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান নেই, তাদের জন্য অর্থবহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন অত্যন্ত কঠিন।

স্বীকৃতি মিললেও সেটির মূল্য সীমিত থাকে, যদি তা জনগণের সম্মতি ও রাজনৈতিক বৈধতার ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়।

বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এলে অধিকাংশ দেশ তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে না। রাশিয়া ও চীন তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালেও তারা এখনো জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তালিকা থেকে তালেবান নেতাদের নাম সরাতে সক্ষম হয়নি।

যতদিন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তালেবান নেতারা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবেন, ততদিন পূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া কঠিনই থাকবে।

বর্তমান আফগানিস্তানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়া উচিত নয় যে,বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে পক্ষ বেছে নেওয়া। বরং জরুরি প্রয়োজন হলো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতা দূর করা এবং প্রকৃত জনভিত্তিক বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা।

যে কোনো আফগান সরকারের মূলনীতি হওয়া উচিত সহজ; আফগানিস্তান যেন অন্য দেশের জন্য হুমকি না হয় এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোও যেন দেশটিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত না করে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান না হয়ে আফগানিস্তানকে আঞ্চলিক সংযোগ এবং সহযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন একটি প্রতিনিধিত্বমূলক এবং আইনের শাসনভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা।

স্বচ্ছ শাসন এবং জবাবদিহিতা ছাড়া বিদেশি শক্তিগুলো আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলবে।

ইতিহাস বলছে, এমন সম্পর্ক খুব কম ক্ষেত্রেই আফগানিস্তানের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পেরেছে।

সবশেষে বলা যায়, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সমঝোতার ওপর নয়, বরং এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করবে, যা নিজ জনগণের আস্থা ও সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম।

শুধুমাত্র তখনই আফগানিস্তান প্রতিযোগিতার ময়দান থেকে বেরিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার সেতুবন্ধনে পরিণত হতে পারবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মির্জা ফখরুলকে সারজিসের প্রশ্ন

৩০ বছর পর দখলমুক্ত সরকারি রাস্তা

হাদি হত্যায় তার বড় ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে : ফারুক হাসান

সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে ‘সব নিরপরাধ মায়ের’ মুক্তি চাইলেন আইভী

ওসির নেতৃত্বে থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত 

নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু ঘিরে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ ছেলের

রিজার্ভ আরও বাড়ল

মায়ানমারে পাচারের পথে বিপুল সিমেন্ট জব্দ, আটক ৯

কারামুক্ত আইভী লড়বেন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে

পদত্যাগের দুদিন পর পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর প্রতি দীপেন দেওয়ানের বার্তা

১০

এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

১১

৫ দিন দেশের আবহাওয়া কেমন থাকবে?

১২

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নূরুল আলমের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

১৩

নিখোঁজের একদিন পর পতিত জমিতে মিলল বৃদ্ধার মরদেহ

১৪

মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় চট্টগ্রামে বর্হিনোঙরে পড়ে আছে ৬০ কোটি টাকার জাহাজ

১৫

দেশে ফেরার পরই কারাগারে, সাবেক সেই প্রধানমন্ত্রী এবার পাচ্ছেন মুক্তি

১৬

যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে : আরাগচি

১৭

ইতিহাসের দীর্ঘতম সফরে নিউজিল্যান্ডে যাচ্ছে ভারত, খেলবে এক ডজন ম্যাচ 

১৮

টিকিট জালিয়াতির আন্তর্জাতিক ফাঁদ

১৯

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নিন্দা / বাজেটের আগে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ‘স্বেচ্ছাচারী’ সিদ্ধান্ত

২০
X