

বিশ্ব মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক নিচেই লাতিন আমেরিকা। মেক্সিকো থেকে শুরু করে একদম দক্ষিণে চিলি আর আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চল। দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকরা এই অঞ্চলকে নিজেদের বাড়ির পেছনের উঠোন হিসেবে গণ্য করে এসেছেন। এ অঞ্চল নিজেদের বলয়ে রাখতে কখনো গোপন সামরিক অভিযান, কখনো সরকার পরিবর্তনের মতো খেলায় নামে ওয়াশিংটন। এর সর্বশেষ উদাহরণ—ভেনেজুয়েলা, বর্তমানে সেখানকার সরকারকে হঠাতে চায় মার্কিন মুলুক। দেশটি ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে যে কোনো সময় সেখানে হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেমনটাই বলেছেন। সম্প্রতি মাদক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বারবার ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অভিযোগ তুললেও বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ভেনেজুয়েলাকে লক্ষ্যবস্তু করার নেপথ্যের কারণ দেশটির তেলভান্ডার।
আধিপত্যের ইতিহাস: লাতিন আমেরিকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৮২৩ সালে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস মোনরো ঘোষণা করেছিলেন বিখ্যাত ‘মোনরো ডকট্রিন’। এই নীতির সারকথা ছিল—‘আমেরিকা কেবল আমেরিকানদের জন্য’। অর্থাৎ, পশ্চিম গোলার্ধে কোনো শক্তি নাক গলাতে পারবে না।
মার্কিন ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি তার বিভিন্ন লেখায় বারবার উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকাকে কখনোই স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখেনি, বরং দেখেছে তাদের সম্পদের ভান্ডার এবং নিরাপত্তার বাফার জোন হিসেবে। চমস্কির মতে, স্নায়ুযুদ্ধের সময় ‘কমিউনিজম প্রতিরোধ’-এর ধুয়া তুলে যুক্তরাষ্ট্র গুয়াতেমালা (১৯৫৪), ব্রাজিল (১৯৬৪) এবং চিলির (১৯৭৩) মতো দেশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক একনায়কদের বসিয়েছে। এই ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপগুলো লাতিন আমেরিকার জনমানসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি স্থায়ী অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
যে কোনো সময় হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলায় যে কোনো সময় হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ তথ্য জানান। ভেনেজুয়েলার ভেতর থাকা কথিত মাদক সাম্রাজ্যের অবকাঠামো এ হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
ভেনেজুয়েলায় নজর কেন ট্রাম্পের: এর পেছনের একটি কারণ আছে বলে গত সপ্তাহে উল্লেখ করেছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। সেটি হলো—তার দেশের বিপুল জ্বালানি তেলের ভান্ডার নিজেদের দখলে নিতে ওয়াশিংটনের তুমুল আগ্রহ।
বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন, সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মাটির নিচে। তা একদমই ঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের (ইআইএ) হিসাবে, ভেনেজুয়েলার কাছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের অপরিশোধিত তেলের ভান্ডার রয়েছে, যা ইরাকের চেয়েও বেশি। এটি বিশ্বে সংরক্ষিত মোট তেলের ৫ ভাগের ১ ভাগ। তবে ভেনেজুয়েলা খুব কম পরিমাণ তেল উত্তোলন করে—প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল। এটি বিশ্বের মোট উত্তোলনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। তেল উত্তোলনের এই পরিমাণ ২০১৩ সালে মাদুরো ক্ষমতা নেওয়ার আগের সময়ের অর্ধেক।
যুক্তরাষ্ট্র কেন ভেনেজুয়েলার তেল চায়: বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র বেশি তেল উত্তোলন করে। এর পরও দেশটির তেল আমদানির দরকার হয়—বিশেষ করে যে ধরনের তেল ভেনেজুয়েলা উত্তোলন করে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে সেগুলো হালকা ও কম সালফারযুক্ত। এগুলো পেট্রোল উৎপাদনের জন্য ভালো হলেও আর বেশি কিছু পাওয়া যায় না। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলায় পাওয়া যায় ভারী ও সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল। এই তেল পরিশোধনের সময় ডিজেল, অ্যাসফাল্ট এবং কলকারখানা ও ভারী যন্ত্রপাতির জ্বালানিসহ বিভিন্ন ধরনের দ্রব্য পাওয়া যায়। বিশ্বজুড়ে ডিজেলের জোগান কমে আসছে। এর বড় একটি কারণ হলো ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। ইআইয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন ভেনেজুয়েলা থেকে এক লাখ দুই হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা মোট তেলের দশম উৎস ছিল ভেনেজুয়েলা। এখন মাদুরোর পতন হলে ভেনেজুয়েলার বিশাল এই তেলের ভান্ডারের ওপর থেকে যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তাহলে সুবিধা পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।