বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

মাদুরোকে অপহরণে নীরব পুতিন, ক্ষুব্ধ শি

সিএনএন ও আলজাজিরার প্রতিবেদন
মাদুরোকে অপহরণে নীরব পুতিন, ক্ষুব্ধ শি

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর নাটকীয় গ্রেপ্তার শুধু একটি দেশের সরকার পতনের ঘটনা নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যে একটি বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর সরাসরি অভিযানে এক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে শয়নকক্ষ থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে—যেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতি নয়, সামরিক সক্ষমতা আর গোয়েন্দা শক্তিই শেষ কথা বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে দুটি পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন। দুদেশই মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেল বিস্ময়কর বৈপরীত্য—রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কার্যত নীরব, আর চীনের সরকারি মহল ক্ষুব্ধ হলেও দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লাস।

পুতিনের নীরবতা: অসহায়তা না কৌশল

মাদুরোর গ্রেপ্তারের পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে নিন্দা করলেও পুতিন নিজে একটি কথাও বলেননি। এই নীরবতা অনেকের চোখে রাশিয়ার দুর্বলতার প্রকাশ।

ভেনেজুয়েলা ছিল লাতিন আমেরিকায় রাশিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র। হুগো চাভেজ ও পরে মাদুরোর আমলে দেশটি রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে। এমনকি রাশিয়ার সহায়তায় ভেনেজুয়েলায় অস্ত্র কারখানাও গড়ে ওঠে। তা সত্ত্বেও মাদুরোকে রক্ষা করতে মস্কো এগিয়ে আসেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে দুটি কারণ। প্রথমত, রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িত এবং আরেকটি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর সামর্থ্য তার নেই। দ্বিতীয়ত, পুতিন বুঝতে পেরেছেন যে এ ঘটনা তাকে দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।

অনেকে মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ কার্যত পুতিনের বহুদিনের যুক্তিকে শক্তিশালী করেছে—বিশ্ব এখন আর আন্তর্জাতিক আইনে চলে না, চলে শক্তির নিয়মে। এর ফলে ইউক্রেন, সাবেক সোভিয়েত অঞ্চল বা মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার কঠোর অবস্থানকে ন্যায্যতা দেওয়া সহজ হবে।

তবে এ নীরবতার আড়ালে গভীর উদ্বেগও রয়েছে। মাদুরোর গ্রেপ্তারে ভেতরের কারও সহযোগিতা ছিল—এ ধারণা পুতিনকে আরও নিরাপত্তা-সচেতন ও সন্দেহপ্রবণ করে তুলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনা পুতিনকে আরও কঠোর ও বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে।

চীনের দ্বৈত প্রতিক্রিয়া: নিন্দা ও অনুপ্রেরণা

চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্বিমুখী। একদিকে বেইজিং প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের তীব্র নিন্দা করেছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এটিকে ‘একতরফা দাদাগিরি’ ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি বলে অভিহিত করেছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমগুলো একে যুক্তরাষ্ট্রের ভণ্ডামির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

অন্যদিকে, চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। উইবোতে কয়েকশ কোটি ভিউ হয়েছে মাদুরোর গ্রেপ্তার সংক্রান্ত আলোচনায়। অনেক ব্যবহারকারী প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন—যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের ‘পেছনের উঠোনে’ এমন অভিযান চালাতে পারে, তবে চীন কেন তাইওয়ানের ক্ষেত্রে একই কাজ করতে পারবে না?

এ আলোচনাগুলো চীনা জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রসঙ্গে এ ঘটনা এক ধরনের ‘ব্লুপ্রিন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সরকারি মহল এই তুলনা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবে তাইওয়ান ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তাইওয়ান একটি সুসংগঠিত, সশস্ত্র ও গণতান্ত্রিক সমাজ, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে ভেনেজুয়েলা ছিল রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং গোয়েন্দা দিক থেকে ভেদ্য।

চীনের অর্থনৈতিক ক্ষতি: বড় হলেও মারাত্মক নয়

মাদুরোর পতন চীনের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা। গত দুই দশকে চীন ভেনেজুয়েলাকে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, যা লাতিন আমেরিকায় চীনের মোট ঋণের প্রায় অর্ধেক। চীন ছিল ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ক্ষতি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক নয়। ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন অনেক কমে গেছে এবং চীন সহজেই বিকল্প উৎস খুঁজে নিতে পারে। আসল ক্ষতি হলো—লাতিন আমেরিকায় চীনের রাজনৈতিক প্রভাব।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত

মাদুরোর গ্রেপ্তার এক ধরনের বার্তা দিয়েছে: কোনো নেতা, যত শক্তিশালী মিত্রই থাকুক না কেন, সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। এটি শুধু রাশিয়া ও চীনের জন্য নয়, বিশ্বের সব কর্তৃত্ববাদী সরকারের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলবে। নেতারা আরও বেশি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক আরও সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠবেন। কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসবে, আর সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা হয়ে উঠবে প্রধান হাতিয়ার।

মাদুরোর গ্রেপ্তার এক ব্যক্তির পতনের গল্প নয়; এটি একটি যুগের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। পুতিনের নীরবতা ও চীনের দ্বৈত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিচ্ছে—বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন একপর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে নৈতিকতা নয়, ক্ষমতাই শেষ সত্য। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন একটাই—পরবর্তী লক্ষ্য কে?

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পত্রিকা অফিসে আগুন দেওয়া ব্যক্তিরা জুলাইয়ের চেতনা ধ্বংসে লিপ্ত : নূরুল কবির

এলাকাবাসীর ধাওয়া খেলেন রিপাবলিক বাংলার সাংবাদিক

নতুন প্রাকৃতিক চিনি ‘ট্যাগাটোজ’ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আশাবাদ

ঢাকায় ঐতিহাসিক সাফা আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

ঝরল জামায়াত কর্মীর প্রাণ

গুম-খুনের বিভীষিকাময় সময়ের অবসান হয়েছে : তারেক রহমান 

টস জিতে ভারতের বিপক্ষে বোলিংয়ে বাংলাদেশ

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ঢাকা-১৮ আসনের বিএনপি প্রার্থীর

জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে আফগানিস্তানের বিশ্বকাপ নায়ক

ওজন মাপা বন্ধ করে প্রাধান্য দিন ফিটনেসকে

১০

ওসমানী হাসপাতালে হামলা, ইন্টার্নদের কর্মবিরতি

১১

শোকজ নোটিশের লিখিত জবাব মামুনুল হকের

১২

জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর স্থগিত

১৩

ভারতকে হারিয়েই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে চায় বাংলাদেশ

১৪

২ লাখ ২১ হাজার কেজি স্বর্ণ তুলল সৌদি আরব

১৫

কর্নেল অলির বিরুদ্ধে মামলা, জামায়াতের বিবৃতি

১৬

পোস্টাল ব্যালটের ডিজাইনে পরিবর্তনের কথা জানাল ইসি

১৭

কালবেলার সাংবাদিকের ওপর হামলা, ৩ দিনেও নেই গ্রেপ্তার

১৮

রাজধানীতে গণমাধ্যম সম্মিলন চলছে

১৯

টক্সিক পরিবারে বড় হয়ে ওঠার কিছু মানসিক ট্রমা

২০
X