

দশকের পর দশক ধরে আকাশে আধিপত্য ছিল মূলত ধনী দেশগুলোর হাতে। তারাই কেবল উন্নত যুদ্ধবিমান তৈরি ও চালানোর বিপুল খরচ বহন করতে পারত। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। সস্তা আক্রমণাত্মক ড্রোন এই সুবিধা-প্রথা ভেঙে দিচ্ছে, ফলে ছোট বা কম সম্পদসম্পন্ন দেশও যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে শুরু করা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র স্থলসেনা না পাঠিয়ে মূলত আকাশ ও দূরনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। এ অভিযানে তারা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫, এফ-২২, বি-৪ এবং এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ব্যবহার করছে।
ড্রোন বনাম যুদ্ধবিমান, খরচের বিশাল পার্থক্য: যুক্তরাষ্ট্রের এ আধুনিক বিমানগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চালাতে উচ্চ প্রশিক্ষিত পাইলট প্রয়োজন। একটি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হলে শুধু যন্ত্রই নয়, দক্ষ মানবসম্পদও হারানোর ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, কমদামি ড্রোন দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ধ্বংস হলেও অপারেটরের কোনো ক্ষতি হয় না এবং একটি ড্রোনের দাম মাত্র ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার।
ইরানের কৌশল, সংখ্যার জোর: ইরান দীর্ঘদিন ধরে ড্রোন তৈরি ও সরবরাহ করছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে তারা হাজারের বেশি ড্রোন ব্যবহার করেছে। তাদের কৌশল হলো একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ছুড়ে দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা। এই ড্রোনগুলো অনেকটা ‘একবার ব্যবহারযোগ্য’। যেগুলো লক্ষ্যে আঘাত করে বিস্ফোরিত হয়। এগুলোর উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় ব্যাপক সংখ্যায় ব্যবহার করা সহজ।
যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ: যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই খরচের অসামঞ্জস্য। কমদামি ড্রোন ভূপাতিত করতে অনেক সময় কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে। পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ‘৫০ হাজার ডলারের ড্রোন ধ্বংস করতে যদি ৩০ লাখ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র লাগে, তাহলে সেটা টেকসই নয়।’
নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি: এই সমস্যার সমাধানে নতুন প্রযুক্তি উন্নয়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে— লেজার অস্ত্র (খরচ প্রতি শটে কয়েক ডলার মাত্র), জ্যামিং সিস্টেম (ড্রোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে) এবং ড্রোন ধ্বংসকারী ড্রোন। উদাহরণ হিসেবে, লেজার অস্ত্র দিয়ে একটি ড্রোন ধ্বংস করতে মাত্র ২-১০ ডলার খরচ হতে পারে, যেখানে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রে খরচ হয় লাখ লাখ ডলার।
ভবিষ্যতের যুদ্ধের রূপ: ইউক্রেন যুদ্ধেও দেখা গেছে, ড্রোন এখন যুদ্ধের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। ধারণা করা হয়, সেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ হতাহতের পেছনে ড্রোনের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে প্রযুক্তিনির্ভর, যেখানে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন বড় ভূমিকা রাখবে।