

ইরান যুদ্ধে নেমে নানামুখী সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ৭০ শতাংশ মার্কিনি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তার জনপ্রিয়তা ক্যারিয়ারের সর্বনিম্ন রেকর্ডের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে। এমনকি ট্রাম্প তার নিজের দল রিপাবলিকানের ভেতরেই ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে পড়েছেন। কংগ্রেসের যেসব রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এতদিন তার বিরুদ্ধে যেতে দ্বিধা করতেন, এখন তারা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। সম্প্রতি তার কিছু সিদ্ধান্ত পাস করতে আটকে দিয়েছেন। এমনকি তাকে পাশ কাটিয়ে কয়েকটি বিলও পাস করিয়েছেন। এদিকে ইরান যুদ্ধ থেকেও বের হতে পারছেন না ট্রাম্প। প্রায় দুই মাস ধরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও উভয়পক্ষ নিজেদের দাবিতে অনড় থাকায় শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হচ্ছে না। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র ইসরায়েলের লক্ষ্য ভিন্ন হওয়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মতপার্থক্যও বাড়ছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক আশঙ্কা করছেন, জ্বালানির দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে এমনটাই উঠে এসেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন, যা মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে করা আগের রয়টার্স/ইপসোস জরিপের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে। এই হার তার বর্তমান মেয়াদে সর্বনিম্ন এপ্রিলের জরিপে উঠে আসা ৩৪ শতাংশ থেকে সামান্য ওপরে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তার প্রথম মেয়াদের সর্বনিম্ন রেটিং ছিল ৩৩ শতাংশ।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাপক জন-অসন্তোষের মুখে পড়েছেন। এই যুদ্ধের ফলেই মূলত সেখানে জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়েছে।
ইরান সংঘাতের অবসান ঘটতে পারে, এমন অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পাম্পে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমলেও এই ৬ দিনের জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৫৯ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা আগামী বছরে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম আরও খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। বিপরীতে মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, পরিস্থিতি ভালো হবে। বাকিরা জানিয়েছেন, তারা নিশ্চিত নন বা দাম একই থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ট্রাম্প গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন শুরু করেন। জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালায়, যার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেয় তেহরান। যুদ্ধের আগে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ৫ ভাগের এক ভাগ পরিবহন করা হতো।
গত এপ্রিল থেকে হামলা ও পাল্টা হামলার গতি কিছুটা কমলেও শান্তি আলোচনা এখনো কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় ট্রাম্প যেভাবে সামলাচ্ছেন, তা মাত্র ২২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সমর্থন করেছেন। ৭০ শতাংশ মানুষই তার এই ভূমিকায় অসন্তুষ্ট। জীবনযাত্রার ব্যয়ের এই বিষয়ে মার্কিন নাগরিকেরা এখন ট্রাম্পের ওপর তার ডেমোক্র্যাট পূর্বসূরি জো বাইডেনের চেয়েও বেশি অসন্তুষ্ট।
এদিকে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকানদের একাধিক সদস্য গত সপ্তাহেই ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের লড়াইয়ের সমালোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউসের বলরুমের সঙ্গে যুক্ত ১০০ কোটি ডলারের তহবিল প্রত্যাখ্যান করেছেন, তার ১৮০ কোটি ডলারের ‘অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন’ (অস্ত্রায়ণবিরোধী) তহবিল থেকে তাকে পিছু হটতে বাধ্য করেছেন এবং অভ্যন্তরীণ গুপ্তচরবৃত্তি-সংক্রান্ত তার আইনকে আটকে দিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া এবং রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি বিল পাস করেছেন রিপাবলিকান-দলীয় সদস্যরা, যাতে প্রেসিডেন্ট ভেটো (বাতিল) দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় পক্ষই অবশ্য এখনই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বাস্তব কোনো বিদ্রোহ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছে। তবে রিপাবলিকানদের একটি অংশের কর্মকাণ্ড তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ইঙ্গিত দিচ্ছে—যার মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও আছেন, যাদের ট্রাম্প নিজে দল থেকে বের করে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন। এটি এখন থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন পর্যন্ত তার সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এর বিরোধিতা করার পর গত বছর সিনেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। টিম বলেন, ‘আমার মনে হয়, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, জনপ্রতিনিধিরা সেভাবেই ভোট দেবেন, যেভাবে তাদের এলাকার ভোটাররা চান।’
আইনপ্রণেতা ও সহকারীরা বলছেন, ট্রাম্প যখন রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি এবং জন কর্নিনের পুনর্নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং ভুল সময়ে নেওয়া বেশ কিছু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের এজেন্ডাকে ঝুঁকিতে ফেলেন, তখন থেকেই ক্ষোভ ও অসন্তোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এদিকে, ইরান যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার জন্য প্রায় দুই মাস ধরে চেষ্টা চালাচ্ছেন ট্রাম্প। তবে সম্মানজনক প্রস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। ইরান তাদের দাবিতে অনড় থাকায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও যুতসই সমাধান আসছে না। অন্যদিকে ইসরায়েলের বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়া। যার সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র রয়েছে। তেহরান মূলত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সমর্থন করে। যে কারণে তাদের শান্তিচুক্তির অন্যতম শর্ত হচ্ছে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে হবে ইসরায়েলকে। যা নিয়ে উভয়সংকটে আছে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র।