

বেতন, পদোন্নতি কিংবা কাজের পরিবেশ; কোন বিষয়টি একজন কর্মীকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করে? সাম্প্রতিক শ্রমবাজারের বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, সব পেশার মানুষের চাকরি ছাড়ার প্রবণতা এক রকম নয়। কিছু খাতে কর্মীরা বছরের পর বছর একই প্রতিষ্ঠানে থাকেন, আবার কিছু খাতে চাকরি বদল যেন প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কম বেতন, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, শারীরিক ও মানসিক চাপ এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সীমিত সুযোগ চাকরি ছাড়ার অন্যতম কারণ। আর এসব কারণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় আতিথেয়তা ও খাদ্যসেবা খাতে।
শীর্ষে হোটেল-রেস্টুরেন্ট খাত
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও খাদ্যসেবা খাতের কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি চাকরি ছাড়েন। ২০২৬ সালের মার্চে এ খাতে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার হার (Quit Rate) ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা অন্যান্য বড় শিল্পখাতের তুলনায় সর্বোচ্চ।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ খাতে কর্মীদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়, অনেক ক্ষেত্রে শিফট পরিবর্তন হয় ঘন ঘন, ছুটির দিনে কাজ করতে হয় এবং আয়ের একটি অংশ টিপসের ওপর নির্ভরশীল থাকে। ফলে ভালো সুযোগ পেলেই অনেকে চাকরি পরিবর্তন করেন।
এরপর কোন খাত?
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী চাকরি ছাড়ার প্রবণতায় শীর্ষ কয়েকটি খাত হলো—
| খাত | চাকরি ছাড়ার হার |
| হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও খাদ্যসেবা | ৪.২% |
| খুচরা বিক্রয় (Retail) | ৩.১% |
| অন্যান্য সেবা খাত | ২.৭% |
| পরিবহন, গুদাম ও ইউটিলিটি | ২.৩% |
| বিনোদন ও রিক্রিয়েশন | ২.২% |
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব খাতে সাধারণত কর্মী নিয়োগের শর্ত তুলনামূলক সহজ হওয়ায় কর্মীরাও দ্রুত চাকরি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কেন এত মানুষ চাকরি ছাড়েন?
শ্রমবাজার বিশ্লেষণে কয়েকটি কারণ বারবার উঠে এসেছে—
১. কম বেতন
যেসব খাতে গড় বেতন কম, সেখানে চাকরি ছাড়ার হার সাধারণত বেশি। কর্মীরা সামান্য বেশি বেতনের সুযোগ পেলেই নতুন প্রতিষ্ঠানে চলে যান।
২. অনিয়মিত কর্মঘণ্টা
রেস্টুরেন্ট, হোটেল ও খুচরা বিক্রয় খাতে নির্দিষ্ট সময়সূচির অভাব কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলে।
৩. কাজের চাপ
খাদ্যসেবা ও আতিথেয়তা খাতে শারীরিক পরিশ্রম, গ্রাহকসেবা এবং ব্যস্ত সময়ের চাপ অনেক বেশি। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কর্মীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
৪. ক্যারিয়ার উন্নয়নের সীমিত সুযোগ
অনেক কর্মী মনে করেন, একই প্রতিষ্ঠানে থাকলে তাদের পেশাগত অগ্রগতি সীমিত। তাই তারা দ্রুত নতুন সুযোগ খোঁজেন।
সবচেয়ে কম চাকরি ছাড়েন কারা?
একই গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে চাকরি ছাড়ার প্রবণতা সবচেয়ে কম। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল সরকারের কর্মীদের Quit Rate ছিল মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে ছিল ০ দশমিক ৮ শতাংশ।
এছাড়া ফাইন্যান্স, বীমা ও তথ্যপ্রযুক্তির কিছু খাতেও চাকরি ছাড়ার হার তুলনামূলক কম। এর পেছনে চাকরির নিরাপত্তা, স্থিতিশীল আয় এবং ভালো সুবিধা-ভাতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কী চিত্র?
বাংলাদেশে এ ধরনের বিস্তারিত ‘Quit Rate’ তথ্য নিয়মিত প্রকাশিত না হলেও মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি বিপণন, রেস্টুরেন্ট, কল সেন্টার, সংবাদমাধ্যম, বিক্রয় ও কিছু সেবাখাতে কর্মী পরিবর্তনের হার তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে সরকারি চাকরি, ব্যাংকিং ও কিছু পেশাদার খাতে চাকরির স্থায়িত্ব বেশি দেখা যায়।
শেষ কথা
চাকরি ছাড়ার প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি খাতের কাজের পরিবেশ, বেতন কাঠামো এবং কর্মীদের সন্তুষ্টিরও গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও খাদ্যসেবা খাতের কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি চাকরি ছাড়েন। অন্যদিকে সরকারি চাকরি এখনো সবচেয়ে স্থিতিশীল কর্মক্ষেত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ফুড এন্ড উইন, টাইম, ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট ও পি আর নিউজওয়্যার