বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামার নয়

দ্য কনভারসেশনের বিশ্লেষণ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামার নয়

পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি আবারও বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে। ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির যবনিকাপাত ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ফের এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট—হরমুজ প্রণালি। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই নতুন সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। কোনো পক্ষের মধ্যেই পিছু হটার লক্ষণ না থাকায় এ যুদ্ধের অবসান আপাতত সুদূর পরাহত।

ইরানের প্রতিরক্ষানীতির মূল ভিত্তি হলো সামরিক প্রতিরোধ। তেহরান মনে করে, হরমুজ প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এর মাধ্যমে তারা যে কোনো মার্কিন বা পশ্চিমা আগ্রাসন রুখে দেওয়ার শক্তি পায়।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনীতির পথ ছেড়ে ফের সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি অবসানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে ইরানি বন্দরগুলো ফের অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য স্পষ্ট—ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিয়ে কৌশলগত এ প্রণালির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

এরই অংশ হিসেবে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী প্রতিটি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর অবাস্তব ২০ শতাংশ শুল্ক বা লেভি আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। মূলত বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর টোল আদায়ের যে পরিকল্পনা ইরান আগে হাতে নিয়েছিল, তাকে নস্যাৎ করতেই ট্রাম্পের এ পাল্টা পদক্ষেপ। তবে এ জবরদস্তিমূলক নীতি কোনো পক্ষকেই নতি স্বীকার করাতে পারছে না, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।

একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের ওপর যৌথ মার্কিন হামলার আগে হরমুজ প্রণালি নিয়ে বড় কোনো বিরোধ ছিল না। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রতিদিন এই অবাধ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হতো।

কিন্তু মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের জবাবে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই অতি-গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি তৈরি হলে তেহরান পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি গঠন করে ওমানকে সঙ্গে নিয়ে এই জলপথ পরিচালনার ও টোল আদায়ের পরিকল্পনা করে।

টানা ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অভ্যন্তরীণ তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে পড়ে ওয়াশিংটন বাধ্য হয়ে কূটনৈতিক পথ বেছে নেয়। ফলস্বরূপ, গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়।

এ চুক্তিতে মূলত দুটি বিষয় পরিষ্কার ছিল, সারা বিশ্বে একযোগে ৬০ দিনের একটি সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে (যার মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল) এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেওয়া হবে।

কিন্তু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, আটকে থাকা ইরানি অর্থ অবমুক্ত করা এবং ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণের মতো অন্যান্য স্পর্শকাতর বিষয়গুলো অমীমাংসিতই থেকে যায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ চুক্তিতে অসন্তুষ্ট হয়ে লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখেন। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্প তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন।

একদিকে রিপাবলিকান ও ইসরায়েলপন্থিদের চাপ, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা—সব মিলিয়ে চুক্তিটি শুরু থেকেই ছিল নড়বড়ে। অবশেষে গত সপ্তাহের শেষদিকে প্রণালিতে অননুমোদিত জাহাজে ইরানের গুলি এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) পাল্টা হামলার মাধ্যমে চুক্তিটি পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংঘাতে দুই দেশেরই অভ্যন্তরীণ কমান্ড কাঠামোর অসংগতি সামনে এসেছে। ইরান মূলত মোজাইক ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি বা বিকেন্দ্রীকৃত সামরিক কমান্ড কাঠামো অনুসরণ করে। এ কৌশলে আইআরজিসি কমান্ডাররা তেহরানের কেন্দ্রীয় নির্দেশ ছাড়াই স্থানীয়ভাবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিয়ে পাল্টা আঘাত হানতে পারেন।

সাম্প্রতিক হামলাগুলোয় ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক শাখার মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয়হীনতা ধরা পড়েছে। ইরানের সরকার এখন দুই ভাগে বিভক্ত—একদিকে সংকটের কূটনৈতিক সমাধানকামী উদারপন্থিরা, অন্যদিকে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে মরিয়া কট্টরপন্থিরা।

বিপরীত মেরূতে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতেও রয়েছে চরম স্ববিরোধিতা। কিছুদিন আগেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জোর দিয়ে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এটি অবশ্যই সম্পূর্ণ টোলমুক্ত থাকতে হবে। অথচ এখন ট্রাম্প নিজেই সেখানে শুল্ক আরোপের পথে হাঁটছেন।

এই শুল্ক কীভাবে আদায় করা হবে, এই ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানের পেছনে মার্কিন কোষাগার থেকে কত অর্থ খসবে, কিংবা তেল ও সারের দাম বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে যে মহামন্দা তৈরি হবে—সে সম্পর্কে ট্রাম্পের নীতিতে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। মধ্যপ্রাচ্যে এ বিপুল পরিমাণ মার্কিন সৈন্য কতদিন মোতায়েন থাকবে, সে বিষয়েও ওয়াশিংটন নীরব।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ইরানের ইসলামী শাসনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে বিশেষভাবে অভ্যস্ত। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করেও তারা ইরাকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছিল। ওয়াশিংটনের সর্বাত্মক সমর্থনপুষ্ট ইরাকি একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে তারা বিন্দুমাত্র ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়নি, কোনো বিজয়ও দাবি করতে দেয়নি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বর্তমান অদূরদর্শী ও আগ্রাসী পরিকল্পনা এ চলমান সংঘাতকে আরও দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ভূরাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো মানদণ্ডেই এই যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বিশ্বের সাধারণ মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনবে না; বরং বিশ্বকে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।

কালবেলা
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পল্লবীতে জলাবদ্ধ এলাকায় টানা চতুর্থ দিনের মতো বিএনপি নেতার খাবার বিতরণ

ফাইনালের দায়িত্ব পাওয়া রেফারির সিদ্ধান্তে ‘পেনাল্টি’ পেয়েছিলেন মেসি

মনপুরায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি ১০ হাজার মানুষ 

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়েছে: অর্থমন্ত্রী

নৌভ্রমণে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে দুই যুবকের মৃত্যু

নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমের পরিচয়

জেলেনস্কির বিরুদ্ধে ইউক্রেনজুড়ে বিক্ষোভ

দেশের ১৩ জেলায় সন্ধ্যার মধ্যে ঝড়-বৃষ্টির আভাস

ফিক্সিংয়ের অভিযোগে সাকিবের দলের মালিক গ্রেপ্তার

বলিউডে আসছে জম্বি মহাযুদ্ধ, শেষ হাসি কে হাসবেন

১০

কানাডায় ভয়াবহ দাবানল, ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ

১১

সংবিধান সংস্কার নয় সংশোধন করতে চাই: মির্জা ফখরুল

১২

বেলুচিস্তানে পাক বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ, নিহত ৩

১৩

বিদ্রোহীদের ২০৫ যুদ্ধযান ধ্বংসের দাবি সুদান সেনাবাহিনীর

১৪

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত, অপেক্ষায় অভিভাবকরা

১৫

অবৈধভাবে বসবাসরত প্রবাসীদের সুখবর দিল ইতালি

১৬

লেবাননে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গড়ছে ইসরায়েল

১৭

রোমে রেড অ্যালার্ট জারি, তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি ছোঁয়ার আশঙ্কা

১৮

ছয় মাসে তুরস্কের আকাশপথ ব্যবহার করেছে ১১ লাখের বেশি ফ্লাইট

১৯

ডেমরা পুলিশ লাইন্সে কনস্টেবলের আত্মহত্যা

২০
X