

দেশ স্বাধীনে অনবদ্য ভূমিকার জন্য জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধারা। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বকে জাতি স্মরণ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যাদের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি রচিত হয়েছে, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা ব্যর্থতায় বাস্তবায়ন তো হয়নি, বরং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় অবহেলিত ছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সমাধি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্প। ‘শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৮ সালে। মূল লক্ষ্য ছিল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা, তাদের স্মৃতি স্থায়ীভাবে ধরে রাখা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও দৃশ্যমানভাবে তুলে ধরা। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, অনিয়ম, অদক্ষ ব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে সাত বছর ধরে চললেও সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়নি, শেষমেশ কাজ অসমাপ্ত রেখেই প্রকল্প সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় দেশজুড়ে ২০ হাজার শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধিস্থল সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করার কথা ছিল। এজন্য খরচ ধরা হয়েছিল ৪৬০ কোটি ৯৭ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। কিন্তু তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি সাত বছর ধরে চললেও কাজ শেষ হয়নি। পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকলেও সাত বছরে মাত্র ৪ হাজার ৩৭১টি সমাধি সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হয়েছে। চরম অবহেলিত এই প্রকল্পের আওতায় বেশিরভাগ উন্নয়ন কাজ হয়েছে নিম্নমানের।
প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদিত হয় ২০১৮ সালের জুনে। ৪৬০ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। পরে সময়সীমা বাড়িয়ে একাধিকবার সংশোধন করা হয়। শেষবার ব্যয় কমিয়ে ৪৪৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সাত বছর ধরে চলতে থাকা প্রকল্পটিতে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মোট ব্যয়ের মাত্র ১৭.৯৮ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ২০ শতাংশ।
বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকলেও সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ায় শেষমেশ বেশিরভাগ কাজ বাদ রেখে আলোচিত এ প্রকল্প শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। যাতে অবশিষ্ট ১৫ হাজার ৬২৯টি সমাধি সংরক্ষণের কাজ বাদ রেখে এবং ব্যয় ৩৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা কমিয়ে প্রকল্প সমাপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
কাজ অসমাপ্ত রেখে প্রকল্প সমাপ্তের যৌক্তিকতা হিসেবে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৩ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এডিপি পর্যালোচনা সভায় আলোচ্য প্রকল্পটি সমাপ্তির সিদ্ধান্ত হয়। এডিপি পর্যালোচনা সভায় সিদ্ধান্ত হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর দ্রুত অসমাপ্ত সমাধির কাজ শেষ করবে, সম্পন্ন কাজের বিল পরিশোধ করবে এবং ২০২৫ সালের জুনে এই প্রকল্প সমাপ্ত করা হবে। ওই সভায় উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী বাকি কাজ অসামপ্ত রেখে প্রকল্প সমাপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থাৎ, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পটি সাত বছরেও পূর্ণতা পেল না। ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়নি, বহু সমাধি অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে রয়ে গেছে অপূর্ণতা আর অব্যবস্থাপনার ছাপ।
সাত বছর ধরে চলা এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যর্থতা নিয়ে সমালোচনা উঠেছে বিভিন্ন মহলে। শুধু বাস্তবায়ন ব্যর্থতা নয়, আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি সংরক্ষণের কাজেও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। নির্মাণকাজ হয়েছে নিম্নমানের।
জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি সংরক্ষণের এই প্রকল্প অসমাপ্ত থেকে যাওয়াকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবহেলা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি সংরক্ষণ শুধু নান্দনিক কাজ নয়, বরং এটি ইতিহাসের দায়বদ্ধতা। এটি তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা করে। কিন্তু বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণে এসব উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একাধিক পরিদর্শনে আলোচ্য প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক সমাধির কাজ মাঝপথে থেমে আছে, আবার কোথাও নিম্নমানের নামফলকের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় পড়তে অসুবিধা হচ্ছে। অযত্ন-অবহেলায় সমাধি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। কোথাও ঝোপঝাড়ে ঢাকা, কোথাও আবার সীমানা দেয়াল ভেঙে পড়েছে।
২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরের অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এ ছাড়া ২০১৮-১৯, ২০২০-২১ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিটও সম্পন্ন হয়নি। অন্যদিকে, প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির জন্য প্রতি তিন মাস অন্তর পিআইসি ও পিএসসি সভা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এসব সভা হয়েছে খুবই কম। আইএমইডি সুপারিশ করে, ভবিষ্যতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব সময়মতো দিতে হবে, অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে এবং প্রকল্প সমাপ্তির তিন মাসের মধ্যে প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) জমা দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ অসমাপ্ত রেখেই প্রকল্প বন্ধ করা নিঃসন্দেহে হতাশার বিষয়। তারা বলেন, দুর্বল মনিটরিং এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতা যাচাইয়ের অভাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পটি সাত বছরেও পূর্ণতা পেল না। এই প্রকল্প অসমাপ্ত থেকে যাওয়া শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি অবহেলার প্রতীক হয়ে থাকবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি নির্মাণ প্রকল্পে যতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল, ততটা দেওয়া হয়নি। দায়সারাভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছিল। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদল হয়েছে কয়েকবার। কাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়। সাত বছর ধরে চললেও প্রকল্পের এক-চতুর্থাংশও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত রেখেই প্রকল্প সমাপ্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক পলি কর ছুটিতে থাকার কথা জানিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ কালবেলাকে বলেন, ‘এখন প্রকল্পটির বাকি কাজ অসমাপ্ত রেখে সমাপ্তির যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, এ বিষয়ে কিছু বলার নেই। তবে অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলেন এটা তাদের ব্যর্থতা, এটার দায় তারা এড়াতে পারেন না। সাত বছর ধরে চলা প্রকল্পের এমন অগ্রগতি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।’