কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ড শক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইসির সংলাপ
নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ড শক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ

সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ড শক্ত করে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বিতর্কিত নির্বাচন করার অভিযোগ কারাগারে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তারা। বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে পরিণতি কী হয়, সে কথা সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দীনসহ অন্য নির্বাচন কমিশনারদেরও মনে রাখতে হবে।

গতকাল রোববার নির্বাচন ভবনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আয়োজিত সংলাপে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেন তারা। এ সময় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বুদ্ধিজীবীরা নাসির কমিশনকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সাহস দেখানোর পরামর্শ দিয়ে প্রয়োজনে পদত্যাগেরও আহ্বান জানান।

সংলাপে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নানা পরামর্শ দেন। তারা বলেন, কমিশনকে সাহসী হয়ে এবং মেরুদণ্ড সোজা করে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে; যাতে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া যায়। যে কোনো সময় মব সৃষ্টির বিষয়ে কমিশনকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তারা বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে।

প্রবাসীদের জন্য আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং উদ্যোগকে স্বাগত জানান তারা। তবে বিষয়টি যাতে বিতর্কিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে ও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য ও এআই জেনারেটেড তথ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কৌশল হাতে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সচেতনতা তৈরি না করে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (পিআর) পদ্ধতি চালু না করার পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে।

এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) পরিবর্তে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। জাতীয় প্রতীক শাপলা কোনো বিশেষ দলকে না দেওয়ার বিষয়ে অনড় থাকার জন্য ইসিকে অভিনন্দন জানানো হয়। একই সঙ্গে শুধু একক প্রার্থীর আসনেই নয়, সব আসনে ‘না ভোট’ প্রবর্তন করা এবং নারী ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানো ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অনুষ্ঠানে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর এবারের নির্বাচনকে দেশের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি ইসিকে উঁচু নৈতিক মানদণ্ড বজায় রেখে সোজা পথে হাঁটার আহ্বান জানান।

সাংবাদিক ও কলামিস্ট সোহরাব হাসান বলেন, আমরা কারিগরি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে। আমাদের একটা ধারণা হয়েছে যে, পাঁচজন নির্বাচন কমিশনার মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন, সবকিছুর দায় তাদের। আমরা অন্যায় করব, অনিয়ম করব, ভোট জালিয়াতি করব, চুরি করব, কিন্তু ইসিকে কাজটা করতে হবে। এটা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, ইসির প্রতি আমাদের আস্থা আছে কি না—তার চেয়ে বড় কথা হলো বর্তমান নির্বাচন কমিশন মনে করে কি না যে, বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। যদি মনে করে, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনের দায় নিতে হবে। যদি মনে না করে, তাহলে আগামী পাঁচ মাসে সরকারের কী করা উচিত, তা জনসমক্ষে জানাতে হবে। তাহলে ইসির প্রতি জনআস্থা আসবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ৫৫ বছর পরও নারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আসনের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ন্যূনতম দাবি ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিশ্চিত করা। এ ছাড়া প্রবাসীদের সন্তানরা পড়াশোনার জন্য দেশে থাকে। তাদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণও গুরুত্ব দিতে হবে।

পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ভোটাররা যেন নিরাপত্তা পায়, তা এখনই দৃশ্যমান করতে হবে। অনেক প্রার্থী পোলিং এজেন্ট দিতে পারেন না। বড় দলগুলো ভয়ভীতি দেখায়। এটা যেন না হয়, তা কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, অনেক অর্জন থাকার পরও আমরা খুব দুঃখী ও দুর্ভাগা। কারণ আমরা এখনো নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক করতে পারিনি। কেন একটি জাতি ও রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। যে রাষ্ট্র তার প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে না, সে জাতি ব্যর্থ হয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাবেক তিন প্রধান বিচারপতির পরিণতি আপনারা দেখেছেন। একজন প্রধান বিচারপতিকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে ৫ আগস্টের আগে। আরেকজনকে মব করে বের করে দেওয়া হয়েছে ৫ আগস্ট। আরেকজন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এখন কারাগারে। আপনারা সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের পরিণতিও দেখেছেন। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, সংসদ বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান কিন্তু নেই। পুলিশের ওপর মানুষের কোনো আস্থা নেই। এমন অবস্থায় কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ, যদি মেরুদণ্ড থাকে, যদি সাহস থাকে, তবেই স্বাধীন হতে পারবেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার বর্তমান পরিস্থিতিকে ভয়াবহ উল্লেখ করে বলেন, গতানুগতিক স্টাইলে নির্বাচন করলে কী হবে, তা অনুমেয়। সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারলে ইসির নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে।

অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাহমুদ হাসানউজ্জামান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান, বিজিএমইর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনি, কবি মোহন রায়হান, টিআইবির পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বক্তব্য দেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চিন্তার অগ্রদূত হিসেবে আপনাদের সঙ্গে এই সংলাপ আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে ভূমিকা রাখবে। তিনি বিশ্বাসযোগ্য, সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান এবং উপস্থিত সবার পরামর্শকে ইসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, প্রবাসীদের জন্য আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এবার মাইলফলক হয়ে থাকবে।

নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে চাওয়ার কথা জানিয়ে সবার সহযোগিতা চান তিনি। সিইসি বলেন, ফোন কলের মাধ্যমে তথ্য ফাঁসের ভয়ে তিনি অনেকের ফোন ধরেন না। তবে ইসির দরজা খোলা এবং যে কোনো সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।

বিবিএসের তথ্য প্রশ্নবিদ্ধ, দেশের জনসংখ্যা এখন ১৯ কোটি: অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) তাহমিদা আহমদ জানান, নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৯ কোটি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছেন ১ কোটি ৫১ লাখ মানুষ।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের (বিবিএস) দেওয়া তথ্যকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ বলেও মন্তব্য করেন ইসি তাহমিদা। তিনি বলেন, জনসংখ্যা নিয়ে বিবিএসের ডাটা প্রশ্নবিদ্ধ। একবার তারা যেটা প্রকাশ করল, পরে আবার সেটা কমিয়ে দেখানোর জন্য বলা হয়েছে।

সংলাপে তাহমিদা আহমদ বলেন, ‘আমরা যে ভোটার তালিকা করলাম বাড়ি বাড়ি গিয়ে, সেখান থেকে তথ্যটা পেয়েছি। এটা একদম ঠিক তথ্য।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

লাম্পি রোগে বাড়ছে গরুর মৃত্যু, ডিমলায় আতঙ্কে খামারিরা

গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ৮

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

বৃহস্পতিবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশের পর বাঁকখালী নদী পরিদর্শনে ইউএনও

ইউএনজিএর সভাপতি হিসেবে কী দায়িত্ব ও মর্যাদা পাবেন খলিলুর রহমান

‘সম্পাদক পরিষদ’ গঠন হয় কীভাবে, জানালেন সাবেক এক সদস্য

মির্জা ফখরুলকে সারজিসের প্রশ্ন

৩০ বছর পর দখলমুক্ত সরকারি রাস্তা

হাদি হত্যায় তার বড় ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে : ফারুক হাসান

১০

সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে ‘সব নিরপরাধ মায়ের’ মুক্তি চাইলেন আইভী

১১

ওসির নেতৃত্বে থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত 

১২

নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু ঘিরে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ ছেলের

১৩

রিজার্ভ আরও বাড়ল

১৪

মায়ানমারে পাচারের পথে বিপুল সিমেন্ট জব্দ, আটক ৯

১৫

কারামুক্ত আইভী লড়বেন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে

১৬

পদত্যাগের দুদিন পর পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর প্রতি দীপেন দেওয়ানের বার্তা

১৭

এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

১৮

৫ দিন দেশের আবহাওয়া কেমন থাকবে?

১৯

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নূরুল আলমের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

২০
X