

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ‘বর্ষা বিপ্লব’-এর পর প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে এই হামলাগুলো মানবাধিকার রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরছে। গত ১৪ জানুয়ারি এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
পুলিশের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ড. ফওজিয়া মোসলেম এই পরিস্থিতির জন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি ও উসকানিমূলক বক্তব্যকে দায়ী করেছেন। তার মতে, এই গোষ্ঠীগুলো নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে। ২০২৫ সালের মে মাসে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সরকারের লিঙ্গসমতা ও নারী অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টাকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানায়। এর পর থেকেই নারীরা মৌখিক, শারীরিক ও ডিজিটাল নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, যা তাদের আরও নীরব করে ফেলছে।
ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এতে গত ডিসেম্বরে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক হিন্দু পোশাককর্মীকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর তথ্যমতে, হিন্দুদের বিরুদ্ধে অন্তত ৫১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ড। এ ছাড়া বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুরাও নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আগে দুজন নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনেও অনেক নারীর অংশগ্রহণ ছিল। তারপরও আসন্ন নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশে শীর্ষস্থানীয় দুটি রাজনৈতিক দলের একটি হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী তাদের মনোনীত ২৭৬ জন প্রার্থীর মধ্যে কোনো নারী প্রার্থী মনোনীত করেনি।
এই প্রেক্ষাপটে পরামর্শ দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের উচিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বিবেচনা করা, যেখানে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা এজেন্ডা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা, রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) পালনের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। সেইসঙ্গে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় সাংবিধানিক বিধান সমুন্নত রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
এগুলো কোনো নতুন প্রস্তাব নয় জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বর্ষা বিপ্লব’-এর আগে ও পরে বাংলাদেশিরা এগুলোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও সব রাজনৈতিক দলকে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া উচিত।
মন্তব্য করুন