

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের এক মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই; বরং সংঘাতের দাবানল প্রতিনিয়িত আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হামলা এবং জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিভিন্ন স্থাপনা ইরানের জোরালো পাল্টা হামলা পুরো অঞ্চলকে এখন এক অনিশ্চিয়তার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বৃদ্ধি এবং ইসরায়েলের সামরিক বাজেট বাড়ানোর মতো ঘটনা এবং ইরানের মাথা নত না করার প্রত্যয়ে এই অঞ্চলে এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ছায়া দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সব পক্ষই এখন একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে ইসরায়েল তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট যেভাবে বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইরানের জ্বালানি ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, তাতে সংঘাতের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে পাস হওয়া ২০২৬ সালের বাজেট সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। প্রায় ২৪৫ বিলিয়ন ডলারের এই বাজেটে সামরিক খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা আগের বছরের তুলনায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেশি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজা, লেবানন এবং সিরিয়ার পর এখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ইসরায়েল নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয় দিয়ে একটি ‘মাল্টি-ফ্রন্ট’ বা বহুমুখী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে চাইছে। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তার মতে, ইসরায়েলের এই বিশাল বাজেট প্রমাণ করে তারা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নয়, বরং হয়তো মাঝপথে বা শুরুর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইরানের বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে মরিয়া।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের পাল্টা হুমকি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। ট্রাম্প সরাসরি ইরানের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এবং গুরুত্বপূর্ণ খারগ দ্বীপ ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে। এশিয়ার বাজারে গতকাল দিনের লেনদেনের শুরুতেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে উঠেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক গভীর সংকটের মুখে।
যুদ্ধের মাস পেরিয়েও পরিস্থিতির উন্নতি নেই: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হওয়ার পর গতকাল ৩১তম দিন অতিবাহিত হয়েছে। এই ৩১ দিনেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো গত ২৪ ঘণ্টায় ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বেশ কয়েকটি বড় শহরে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। বিশেষ করে তেহরান ও ইস্পাহানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তেহরানের ‘ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ ও ইস্পাহান ‘ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি’তে চালানো হামলায় ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা জবাব দেওয়া হচ্ছে প্রবলভাবে। ইসরায়েলের হাইফায় অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ‘বাজান’ তেল শোধনাগারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। পাশাপাশি ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও এখন নিয়মিত হামলার শিকার হচ্ছে। বাগদাদের অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘ভিক্টরি বেস’ লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন ও রকেট হামলায় একটি মার্কিন পরিবহন বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিক্টরি বেসের মতো সুরক্ষিত স্থানে হামলা চালানো ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা জানান দিচ্ছে।
আকাশসীমায় নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক টানাপড়েন: যুদ্ধের বিস্তৃতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও মেরূকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে স্পেন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন কোনো সামরিক বিমান তাদের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে না। স্পেনের এই অবস্থান পেন্টাগনকে তাদের যুদ্ধবিমানের রুট পরিবর্তনে বাধ্য করেছে।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও আলোচনার টেবিল এখনো পুরোপুরি শূন্য হয়ে যায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে একটি পরোক্ষ আলোচনা চলছে। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই এই দাবিকে নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ১৫ দফা প্রস্তাব অত্যন্ত ‘অযৌক্তিক’। তবে ট্রাম্প জানিয়েছেন, পাকিস্তান বর্তমানে তাদের পতাকাবাহী ২০টি তেলের ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবুও ট্রাম্পের কণ্ঠে যুদ্ধের দামামা কমেনি; তিনি জানিয়েছেন, এখনো ইরানের প্রায় ৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
যুদ্ধে উভয়পক্ষেই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি: এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই বিধ্বংসী যুদ্ধে উভয় পক্ষেই প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে চলেছে। মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের ভয়াবহতা কোনো নির্দিষ্ট সীমায় আটকে নেই। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৪৬১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৫১ জনই বেসামরিক নাগরিক, যাদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা ২৩৬ জন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে, যার ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে দীর্ঘ সময় ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎহীন অবস্থা বিরাজ করছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় গত চার সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে হিজবুল্লাহর প্রায় ৪০০ যোদ্ধা এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উদ্ধারকর্মী ও সাংবাদিক রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে এখন পর্যন্ত ১৯ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ইসরায়েল বেশ গোপনীয়তা বজায় রাখছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, যুদ্ধে তাদের ২৬১ জন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। তবে ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আহতের প্রকৃত সংখ্যা ৬ হাজার ৮ জন।
ইরাকে সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১০০ জন। এ ছাড়া কুয়েত, কাতার এবং সৌদি আরবেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। এমনকি লেবাননে দায়িত্বরত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীও (ইউএনআইএফআইএল) হামলার হাত থেকে রেহাই পায়নি; সেখানে একজন ইন্দোনেশীয় শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক প্রভাব: মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন আর কেবল আঞ্চলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় এবং ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলারে উঠে যাওয়ায় সারা বিশ্বে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নতুন ‘টোল ব্যবস্থা’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে, যা কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
কোনদিকে যাচ্ছে পরিস্থিতি: যুদ্ধের বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কোনো তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির দিকে নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমুখী যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে। ইসরায়েলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট এবং সামরিক খাতে বরাদ্দ ব্যাপক বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, তারা সিরিয়া, লেবানন ও ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া’র প্রকাশ্য ইচ্ছা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনা ধ্বংস করার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিপরীতে ইরানও দমে যাওয়ার পাত্র নয়; তারা হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নতুন ‘টোল ব্যবস্থা’ চালুর পরিকল্পনা করছে, যা কার্যকর হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের দাম আরও আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষক ম্যাডিসন কার্টরাইটের মতে, এই সংঘাত অন্তত আগামী জুন মাস পর্যন্ত গড়ালে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কূটনৈতিক টেবিলে পাকিস্তানের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনার কথা শোনা গেলেও, বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্র তেহরান থেকে বৈরুত পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে সব পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি ও অনমনীয় অবস্থান এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্য সম্ভবত এক ভয়াবহ ও প্রলম্বিত সংকটের গভীরে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে।