

কুতুবউদ্দিন মাহমুদ ইবন মাসউদ আল-শিরাজি ছিলেন মধ্যযুগের একজন দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক, গণিতবিদ ও সুফি। তিনি ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দে (৬৩৪ হিজরি) পারস্যের শিরাজনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের সময় ইসলামী বিশ্বে বিজ্ঞান ও দর্শনের স্বর্ণযুগ চলছিল এবং ইবনে সিনা, ইবনে হাইসম ও নাসিরউদ্দিন আত-তুসির মতো মনীষীদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল জ্ঞানের নানা শাখায়।
কুতুবউদ্দিনের বাবা ছিলেন একজন দক্ষ চিকিৎসক, যিনি স্থানীয় রাজসভায় চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাবার কাছেই তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান শিখতে শুরু করেন। পরে তিনি শিরাজের বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, ইসলামী দর্শন (কালাম), এবং গণিত অধ্যয়ন করেন। তরুণ বয়সে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করে চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি পান।
কুতুবউদ্দিন আল-শিরাজির জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো মহান বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ নাসিরউদ্দিন আত-তুসির অধীনে তার অধ্যয়ন। তুসির তত্ত্বাবধানে তিনি মারাগা মানমন্দিরে কাজ করার সুযোগ পান, যা সে যুগে জ্যোতির্বিদ্যার এক বিশাল গবেষণাকেন্দ্র ছিল। ওই সময় তিনি জ্যোতির্বিদ্যা, অপটিকস (আলোবিদ্যা) এবং গোলকীয় গণিতের ওপর অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন।
কুতুবউদ্দিন আল-শিরাজি জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনের পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তিনি ‘ইখতিয়ারাতে মুজাফফরি’ নামে একটি চিকিৎসা গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। জ্যোতির্বিদ্যায় তার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘নিহায়াতুল ইদরাক ফি দিয়ানাতিল আফলাক’, যেখানে তিনি মহাবিশ্ব ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি নিয়ে বিশদ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি তুসির পদ্ধতি আরও উন্নত করেন এবং পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্ববীক্ষার মধ্যে গণিতভিত্তিক সমাধান প্রস্তাব করেন, যা পরে কপর্নিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক তত্ত্বের বিকাশে প্রভাব ফেলে। অপটিকস বা আলোবিদ্যায়ও তার অবদান ছিল যুগান্তকারী। তিনি রংধনুর উৎপত্তি নিয়ে তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যা পরে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দর্শনে তিনি ইবনে সিনা ও ফখরউদ্দিন রাজির ধারার অনুসারী ছিলেন, তবে নিজস্ব ব্যাখ্যায় ইসলামী দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও সুফিবাদকে সমন্বিত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি যুক্তি ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করতে চেয়েছেন, যা তাকে সুফি দর্শনের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
কুতুবউদ্দিন জীবনের শেষভাগে তাবরিজে বসবাস করেন এবং সেখানে শিক্ষকতা ও লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন। ১৩১১ খ্রিষ্টাব্দে (৭১২ হিজরি) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, বরং জ্ঞানের ঐক্য ও মানবিকতার সাধক ছিলেন, যিনি যুক্তি, আধ্যাত্মিকতা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মধ্যে সেতুবন্ধ স্থাপন করেছিলেন।