

বাংলাদেশের সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিদিন অসংখ্য নতুন হাত জন্ম নিচ্ছে। কেউ কবিতার পঙক্তিতে নিজের অশান্ত হৃদয়ের ভাষা খুঁজে পায়, কেউ গল্পে সমাজের অবহেলিত মানুষদের তুলে ধরে, কেউ আবার কলামে সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক সত্যকে শব্দে বাঁধতে চায়। তারা সবাই একেকটি সম্ভাবনার আলো, যাদের কলম থেকে বেরিয়ে আসতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাহিত্য-সম্পদ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, আমাদের সমাজে, বিশেষ করে সাহিত্য ও পত্রিকার মতামত বিভাগে নতুন লেখকরা এখনো অবহেলার শিকার। এ অবহেলা শুধু একজন মানুষের হতাশা নয়, এটি গোটা জাতির জন্য প্রতিভা হারানোর শঙ্কা।
পরিচয় বনাম মান—আমাদের দেশে লেখালেখির ক্ষেত্রে মানের চেয়ে পরিচয় অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। একটি লেখা যদি পরিণত ও গভীর হয়, কিন্তু লেখক যদি অপরিচিত বা নতুন হন, তবে সেটি প্রায়ই প্রকাশনার আলো দেখতে পায় না। অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠিত লেখকের সাধারণ মানের লেখা অনায়াসেই ছাপা হয় শুধু তার নামের ওজনেই। ফলে সাহিত্য ও কলাম উভয় ধারার নতুন লেখকরাই হোঁচট খান এই পরিচয়নির্ভরতার কাছে। একজন তরুণ সাহিত্যিক যখন কবিতা বা গল্প পাঠান কোনো পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদককে, তিনি অনেক সময় তা পড়ে দেখার আগেই অবজ্ঞাভরে সরিয়ে রাখেন শুধু লেখকের নাম অচেনা বলে। একইভাবে, নতুন কলাম লেখক সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা রাজনীতির কোনো জ্বলন্ত প্রশ্নে কলম ধরলে তার লেখা সম্পাদকীয় টেবিলে পৌঁছায় না। কারণ তিনি পরিচিত মুখ নন, প্রভাবশালী কোনো মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। এই অযৌক্তিক মানসিকতা নবীনদের ভেতরে হতাশা জন্ম দেয়, তাদের কলমকে শুকিয়ে ফেলে।
সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠানের দায়: বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় দৈনিকে সাহিত্য ও মতামত বিভাগ রয়েছে। সেখানে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করেন অল্প কয়েকজন চেনা লেখক। তারা নিঃসন্দেহে দক্ষ, কিন্তু একই নামের পুনরাবৃত্তি পাঠকের মধ্যে একঘেয়েমি তৈরি করে। নতুন কণ্ঠস্বর প্রবেশ না করলে সাহিত্য বা কলামচর্চা প্রাণ হারায়। সম্পাদকরা প্রায়ই যুক্তি দেন, ‘পাঠক নতুনদের লেখা গ্রহণ করবেন না।’ অথচ ইতিহাস বলে অন্য কথা। নজরুল ইসলাম যদি তার প্রথম দিকের কবিতাগুলো প্রকাশের সুযোগ না পেতেন, তবে ‘বিদ্রোহী’ কবির আবির্ভাব ঘটতে পারত? জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে একসময় সমসাময়িকরাই তুচ্ছ করেছিলেন। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে তার কবিতাই আজ বাংলা সাহিত্যের মহিরুহ। পত্রিকার কলাম জগতেও একই উদাহরণ পাওয়া যায়। একসময় অখ্যাত ছিলেন যারা, তারাই আজ জনমত গঠনের প্রধান কণ্ঠস্বর। তাই সম্পাদক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাবতে হবে, তাদের অবহেলার কারণে হয়তো আগামী দিনের কোনো জীবনানন্দ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।
নতুন লেখকের যন্ত্রণা: কল্পনা করুন এক তরুণী, যিনি রাত জেগে লিখেছেন একটি গল্প। সেই গল্পে তিনি তুলে ধরেছেন তার দেখা গ্রামের দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম। যখন তিনি গল্পটি পাঠালেন কোনো জাতীয় দৈনিকে, তখন সম্পাদক তা ফেরত দিলেন এক কথায়, ‘আপনার লেখা মানসম্মত নয়।’ কিন্তু কোনো মন্তব্য বা পরামর্শ তাকে দেওয়া হলো না। ফলে তিনি জানতেই পারলেন না তার লেখার দুর্বলতা কোথায়। কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে তিনি লেখালেখি ছেড়ে দিলেন। আবার একজন তরুণ কলাম লেখক রাষ্ট্রের দুর্নীতি বা বেকারত্ব নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ লেখা তৈরি করলেন। সম্পাদক সেটি গ্রহণ না করে প্রকাশ করলেন একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের গড়পড়তা লেখা। তখন নতুন লেখকের ভেতরে জন্ম নেয় তীব্র ক্ষোভ ও বঞ্চনার বোধ। এ যন্ত্রণা থেকে অনেকেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, আবার অনেকে চিরতরে কলম ছেড়ে দেন। প্রতিভা হারানোর দায় কার? প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি লেখকের নামের বদলে লেখার মানকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সাহিত্য ও কলাম উভয় ধারাই সমৃদ্ধ হবে। আর পাঠকরা যদি নতুন কণ্ঠস্বরকে গ্রহণে কুণ্ঠিত না হন, তবে নবীনদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। নতুন লেখকদের জন্য দরজা খুলে দিতে হবে, তাদের প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের দিকে আঙুল তুলবে এই বলে, তোমরা প্রতিভাকে অবহেলায় মেরে ফেলেছিলে।
মো. শামীম মিয়া
আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ী সাঘাটা গাইবান্ধা