

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে লাঙল, কোদাল, কাস্তে হাতে শুরু কৃষকের সংগ্রাম যেন ছিল বাংলাদেশের গ্রামগুলোর এক চিরায়ত দৃশ্য। ৭০-এর দশকে এই দেশের শতকরা ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তখন দেশের প্রধান জীবিকাই ছিল কৃষি। কিন্তু কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ চিত্র বদলে যেতে থাকে। শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির প্রসারে এখন কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ শতাংশে। অটোমেশন, যান্ত্রিক চাষাবাদ, ড্রোন প্রযুক্তি কৃষিক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে এক নতুন বিপ্লব, তেমনি এসব প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কমিয়ে দিচ্ছে শ্রমিক প্রয়োজনীয়তা। এখন বাংলাদেশের কৃষক শুধু শ্রমিক নয়, হয়ে উঠেছে অ্যাগ্রি-টেক উদ্যোক্তা।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতি কৃষিক্ষেত্রে এনেছে আমূল পরিবর্তন। এখন কৃষিকাজের জন্য কৃষকের নয়; বরং প্রয়োজন হয় মেশিনের। যেখানে আগে মানুষ হাত দিয়ে কাজ করত। এখন সেই কাজ করা হয় মেশিন বা প্রযুক্তির মাধ্যমে—একেই বলে অটোমেশন।
বাংলাদেশের চাষাবাদে অনেক ধরনের অটোমেশন পদ্ধতি চালু রয়েছে। যেমন: কম্বাইন হারভেস্টার, ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেম, অটো স্প্রিংকলার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, ড্রোন সার্ভেইল্যান্স ইত্যাদি। অটোমেশন শুধু কৃষিকাজ সহজ করছে না, কৃষির রূপকল্পই নতুনভাবে গড়ে তুলছে। তবে প্রশ্ন হলো—এ পরিবর্তনের ঢেউয়ে কৃষকের নিজস্বতা টিকে থাকবে তো?
অটোমেশনকে কেউ আশীর্বাদ বলে আবার কেউ অভিশাপ। নতুন নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব দেশের কৃষিক্ষেত্রকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুভাবেই প্রভাবিত করে। The impact of ICTs on agricultural production in Bangladesh: A study with food crops (2016) নামে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব এলাকায় কৃষিতে প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা ব্যবহার করা হয়েছিল—সেই এলাকায় সাধারণ এলাকার তুলনায় বোরো ধান উৎপাদন বেশি হয়েছে। ২০১৪ সালের মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারকারী কৃষকরা প্রতি হেক্টরে গড়ে ৫ দশমিক শূন্য ৭ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন করেছে, যেখানে সাধারণ কৃষকদের উৎপাদন ছিল তুলনামূলকভাবে কম, মাত্র ৪ দশমিক ১৬ মেট্রিক টন। আবার আরেকটি সমীক্ষায় দেখা যায়, যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে কৃষিজ পণ্য যেমন: ধান, গম, আলু ইত্যাদির উৎপাদন-ব্যয়ের অনুপাত উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (BARD) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান উৎপাদনের খরচ প্রায় ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ কম। তা ছাড়া এসব উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের আয়ও সাধারণ পদ্ধতির তুলনায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে সক্ষম। কিন্তু এত সুবিধা থাকার পরও অটোমেশন কি কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় নিয়ে আসছে?
অটোমেশনের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব হলো, মেশিন মানবশ্রমের জায়গা যন্ত্র দখল করে নিচ্ছে। আগে যেখানে এক একর ফসল তুলতে ১০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, সেখানে একটিমাত্র মেশিনই সেই কাজ করে দিচ্ছে। এতে করে হাজারো দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ছে। এ সব যন্ত্রপাতি কিনতে বড় অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয়, যা তুলনামূলক অর্থবান কৃষকরা বহন করতে পারে ঠিকই; কিন্তু ছোট ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে তা সম্ভব নয়। ফলে, স্বাবলম্বী কৃষক আরও স্বাবলম্বী হচ্ছে এবং গরিব কৃষক আরও পিছিয়ে পড়ছে। এতে গ্রামীণ সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। আগে আমাদের কৃষিসমাজে কৃষকরা যেমন নিজেদের জ্ঞান, চিন্তাশক্তি, অভিজ্ঞতা দিয়ে কৃষিক্ষেত্র পরিচালনা করত; এখন সবকিছু প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় সেই মানবিক দক্ষতা ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা যায়, অটোমেশন কৃষিক্ষেত্রে যেমন উৎপাদনের গতি বাড়ায়, তেমনি অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মহীনতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতাও তৈরি করছে, যা নতুন এক কৃষি-সংকটের জন্ম দেয়। তাহলে কি কৃষিক্ষেত্রে অটোমেশনের ব্যবহার যুক্তিযুক্ত নয়?
এ প্রশ্নের উত্তর হিসেবে বলা যায়, কৃষিক্ষেত্রে অটোমেশনের ব্যবহার তখনই যথাযথ হবে, যখন শ্রমিক ও যন্ত্রের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হবে। অটোমেশন কৃষকের শত্রু নয়; বরং এটি হতে পারে কৃষকের সহায়ক শক্তি। আধুনিক যন্ত্রের সঠিক ব্যবহার যেমন উৎপাদন বাড়ায়, তেমনই সময় ও পরিশ্রমও কমায়। কিন্তু এ প্রযুক্তির ব্যবহার যেন কৃষকের জীবিকা কেড়ে না নেয়, তার জন্য দরকার যথাযথ পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ। ছোট ও মাঝারি কৃষকদের জন্য ভর্তুকি, যন্ত্র ব্যবহারে প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে প্রযুক্তির প্রয়োগ ও যন্ত্রের মধ্যে সমন্বয় ঘটলেই গড়ে উঠবে আধুনিক, টেকসই ও মানবিক কৃষি ব্যবস্থা।
অদ্রিতা দাস, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়