কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শান্তির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র দারিদ্র্য দূরীকরণ

মোহাম্মদ ফাছিহ-উল ইসলাম শাইয়্যান
শান্তির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র দারিদ্র্য দূরীকরণ

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলতে আমরা কী বুঝি? সীমান্তে সেনা, আকাশে যুদ্ধবিমান, সমুদ্রে নৌবহর—এ দৃশ্যই আমাদের মানসচক্ষে ভাসে। জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, যা নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়— ক্ষুধার্ত, বেকার ও হতাশ জনগোষ্ঠী নিয়ে কি কোনো রাষ্ট্র নিরাপদ থাকতে পারে?

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তবতা বলছে, জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তির ওপর নির্ভরশীল। আর এ স্থিতিশীলতার ভিত্তি হলো দারিদ্র্য হ্রাস ও জীবিকার নিরাপত্তা।

বাজেটের আয়নায় নিরাপত্তা নীতি: প্রতিরক্ষা বনাম কৃষি

২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার ১৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। অন্যদিকে, একই বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৭ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ৩.৮ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে—রাষ্ট্র নিরাপত্তার ধারণা এখনো প্রধানত সামরিক খাতে কেন্দ্রীভূত। অথচ দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিনির্ভর।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দের অংশ প্রায় ৫.৮-৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা বিশেষজ্ঞদের মতে প্রয়োজনের তুলনায় কম। অর্থাৎ, বাজেটের আকার বাড়লেও কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ভাগ বাড়ছে না।

কৃষি বাজেট কমে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ে

বাজেটে কৃষির অংশ কমে গেলে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়। কৃষিতে বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন ঝুঁকি বাড়ে, গ্রামীণ দারিদ্র্য বাড়ে, শহরমুখী অভিবাসন বাড়ে এবং সামাজিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। ইতিহাস বলছে, খাদ্য সংকট ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বহু দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণঅভ্যুত্থান ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে গ্রামীণ দারিদ্র্য বাড়া মানে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি। অর্থনৈতিক হতাশা, রাজনৈতিক চরমপন্থা, সামাজিক বিভাজন ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, যা কোনো যুদ্ধবিমান দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

যৌথ কৃষি অবকাঠামো: নতুন ধরনের নিরাপত্তা বিনিয়োগ

এ প্রেক্ষাপটে একটি নতুন নীতিধারণা সামনে আসছে—যৌথ কৃষি অবকাঠামো (Shared Agricultural Infrastructure)। এটি শুধু কৃষি প্রযুক্তি নয়; এটি একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শাসন কাঠামো, যেখানে সরকার, আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও কৃষকরা যৌথভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে আধুনিক করে তোলে।

এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে:

ক. স্যাটেলাইটভিত্তিক রোগ ও আবহাওয়া পূর্বাভাস

খ. ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ ও ডেটা প্ল্যাটফর্ম

গ. স্মার্ট কৃষি ভ্যালু চেইন ও বাজার তথ্য ব্যবস্থা

ঘ. আন্তর্জাতিক কৃষি ডেটা শেয়ারিং অবকাঠামো

বাংলাদেশে GEOPOTATO প্রকল্প দেখিয়েছে, স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে আগাম সতর্কতা দিলে ফসল ক্ষতি কমে এবং কৃষকের আয় বাড়ে। অর্থাৎ, কৃষিতে প্রযুক্তি বিনিয়োগ মানে দারিদ্র্য হ্রাস আর দারিদ্র্য হ্রাস মানে সামাজিক স্থিতিশীলতা।

আন্তর্জাতিক ব্যবসা: ভূরাজনৈতিক অংশীদার

আন্তর্জাতিক কৃষি ও প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, মূলধন ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক। তারা কৃষি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করলে তা শুধু CSR নয়, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কৌশল। স্থিতিশীল কৃষি অর্থনীতি মানে স্থিতিশীল বাজার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মানে বিনিয়োগ নিরাপত্তা। সামাজিক শান্তি মানে সরবরাহ চেইনের ধারাবাহিকতা। অতএব, কৃষি অবকাঠামোতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ একটি নতুন ধরনের শান্তি কূটনীতি।

শান্তি: সামরিক ভারসাম্য নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

শান্তি সাধারণত সামরিক ভারসাম্য বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে অর্জিত হয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হলে রাজনৈতিক চুক্তি টেকে না। আফগানিস্তান, ইরাক বা দক্ষিণ সুদানের মতো দেশগুলোতে রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হয়েছে মূলত অর্থনৈতিক পুনর্গঠন দুর্বল থাকার কারণে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শান্তি একটি উদ্ভূত সামাজিক অবস্থা, যা দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা থেকে জন্ম নেয়। অর্থাৎ, শান্তি সামরিক বাজেটের মাধ্যমেই শুধু নয়, মানুষের জীবিকার মাধ্যমেও।

বাংলাদেশের জন্য নীতিগত প্রশ্ন

বাংলাদেশ কি প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াবে, নাকি কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৌশলগত বিনিয়োগ করবে? প্রশ্নটি সামরিক বনাম কৃষি নয়; প্রশ্নটি স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তা বনাম দীর্ঘমেয়াদি শান্তি। যদি কৃষি অবকাঠামো, ডিজিটাল কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় আকারে বিনিয়োগ করা হয়, তবে তা—ক. দারিদ্র্য কমাবে; খ. গ্রামীণ স্থিতিশীলতা বাড়াবে; গ. শহরমুখী অভিবাসন কমাবে; ঘ. সামাজিক বিভাজন হ্রাস করবে; ঙ. দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। এগুলোই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রকৃত ভিত্তি।

রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন দর্শন

এ দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে। আমরা দারিদ্র্যকে মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখি; কিন্তু বাস্তবে এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভূরাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একটি ক্ষুধার্ত রাষ্ট্র কখনো নিরাপদ রাষ্ট্র হতে পারে না, যত যুদ্ধবিমানই থাকুক না কেন।

নিরাপত্তার নতুন সংজ্ঞা

একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সংজ্ঞা বদলাতে হবে। নিরাপত্তা শুধু সীমান্তে নয়; নিরাপত্তা মানুষের পেটে, কৃষকের জমিতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে। যদি বাংলাদেশ দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কৃষি অবকাঠামোকে জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে তা শুধু উন্নয়ন নয়, একটি টেকসই শান্তি রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তুলবে। সামরিক বাজেট প্রয়োজন; কিন্তু শান্তির সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ।

লেখক: আইটি উদ্যোক্তা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে ইসরায়েল : ট্রাম্প

যশোরে আ.লীগ-যুবলীগের তিন নেতা গ্রেফতার

গোপালগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতার পদত্যাগ

নিখোঁজের ৪ দিন পর প্রবাসীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

ক্যানসার শনাক্তে দেশে প্রথম রোবটিক প্রোস্টেট বায়োপসি হলো স্কয়ারে

আমার কথা বলে তাহেরী হুজুর আলোচনায় থাকতে চান : সামান্তা

অভিষেক ম্যাচেই ৪৭ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন ভারতীয় ক্রিকেটার 

হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন খাবেন যে পাঁচ খাবার

৩৪ তলার ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

১০

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

১১

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

১২

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

১৩

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

১৪

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

১৫

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

১৬

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

১৭

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১৮

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১৯

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

২০
X