ড. মো. নজরুল ইসলাম
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবহেলিত একটি দিক

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবহেলিত একটি দিক

মানবসভ্যতার ইতিহাসে কাঠের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রস্তর যুগের আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার নৌযান, কৃষিভিত্তিক সমাজের লাঙল কিংবা আধুনিক নগর সভ্যতার আসবাবপত্র সবখানেই কাঠ মানুষের সঙ্গী। বাংলাদেশে কাঠ শুধু একটি নির্মাণ উপকরণ নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামের ঘর, গবাদি পশুর খোঁয়াড়, নৌকা, মাচা, খাট-পালং সবকিছুতেই কাঠের উপস্থিতি চোখে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের ব্যবহার বহুগুণ বেড়েছে। এই বাড়তি চাহিদা যদি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের মাধ্যমে সামাল দেওয়া না যায়, তবে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বনভূমির ওপর। বাংলাদেশের মোট ভূমির তুলনায় বনভূমির পরিমাণ কম। প্রাকৃতিক বন, সামাজিক বনায়ন, উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ এবং পাহাড়ি বন—সব মিলিয়ে এই বনভূমি দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তার মূল ভরকেন্দ্র। এ প্রেক্ষাপটে কাঠ সংরক্ষণ কার্যকর হলে বন থেকে নতুন করে কাঠ আহরণের চাপ কমে। অর্থাৎ কাঠ সংরক্ষণ পরোক্ষভাবে বন সংরক্ষণের একটি হাতিয়ার।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় এক দিকে যেমন অবকাঠামো, নগরায়ণ ও শিল্পায়নের গতি বাড়ছে, অন্যদিকে তেমনি বাড়ছে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ। সীমিত বনভূমি, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত—এই তিন বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাঠ আজ একটি কৌশলগত সম্পদ। প্রশ্ন হলো, নতুন করে বন উজাড় না করেই কীভাবে কাঠের চাহিদা মেটানো যায় এবং একই সঙ্গে পরিবেশ ও অর্থনীতিকে টেকসই রাখা সম্ভব? এ প্রশ্নের একটি কার্যকর, কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত উত্তর হলো কাঠ সংরক্ষণ। কাঠ সংরক্ষণ শুধু একটি প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Sustainable Development Goals- SDGs) অর্জনের একটি নীরব কৌশল।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামাজিক ন্যায়ের মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তোলার বৈশ্বিক অঙ্গীকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় SDGs গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এ লক্ষ্যসমূহ অর্জনের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বনজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণ একটি মৌলিক শর্ত, আর এ প্রেক্ষাপটে কাঠ সংরক্ষণ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাঠ সংরক্ষণ প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কাঠের আয়ুষ্কাল বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব, যা একদিকে বনজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমায়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সাশ্রয় নিশ্চিত করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে কাঠ সংরক্ষণ সরাসরি এসডিজি-১২ (Responsible Production and Consumption), এসডিজি-১৩ (Climate Action) এবং এসডিজি-১৫ (Life on Land)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। কাঠের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পেলে একই পরিমাণ কাঠ দীর্ঘসময় ব্যবহার করা যায়। ফলে নতুন করে গাছ কাটার প্রয়োজন কমে এবং বন উজাড়ের হার হ্রাস পায়। এর মাধ্যমে কার্বন ধারণক্ষমতা বজায় থাকে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি কাঠ সংরক্ষণ শিল্পের বিকাশ গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, যা এসডিজি-৮ (Decemnt Work and Economic Growth) অর্জনে অবদান রাখে। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব কাঠ সংরক্ষণ প্রযুক্তি, যেমন—বোরনভিত্তিক প্রিজারভেটিভ, তাপপ্রক্রিয়াজাত কাঠ (Thermally Modified Wood) ও প্রাকৃতিক নির্যাসভিত্তিক সংরক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণ করলে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি কমিয়ে টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে এসডিজি-৯ (Industry, Innovation and Ifrastructure)-এর লক্ষ্যও পূরণ হয়। কাঠ সংরক্ষণ শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি নীতিমালা, গবেষণা, জনসচেতনতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সঠিক মান ও বিধিমালা অনুসরণ করে কাঠ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সরকারি অবকাঠামো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ঘরবাড়ি আরও টেকসই ও নিরাপদ করা সম্ভব, যা এসডিজি-১১ (Sustainable Cities and Communities) অর্জনে সহায়ক। সর্বোপরি, কাঠ সংরক্ষণকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশল ও এসডিজি বাস্তবায়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে। তাই সংরক্ষণ বিষয়টি কেবল বন বিভাগ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আলোচ্য নয়; এটি টেকসই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কাঠ সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। দেশের প্রাকৃতিক বন—বিশেষ করে সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বন ও শালবন এরই মধ্যে নানা ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের চাহিদা বাড়ছে। এই চাহিদা যদি শুধু নতুন গাছ কেটে পূরণ করা হয়, তবে এসডিজি ১৫-এর লক্ষ্য অর্জন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর বিকল্প হলো দ্রুতবর্ধনশীল ও তুলনামূলক কম মূল্যবান প্রজাতির কাঠ যেমন কেওড়া, গেওয়া, আকাশমণি বা ইউক্যালিপটাসকে সংরক্ষণ করে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করা। এতে একদিকে প্রাকৃতিক বনজ প্রজাতির ওপর নির্ভরতা কমে, অন্যদিকে একই পরিমাণ জমি থেকে প্রাপ্ত কাঠের ব্যবহারিক মূল্য বহুগুণে বেড়ে যায়। এটি সম্পদ ব্যবস্থাপনার এক কার্যকর বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি।

কাঠ সংরক্ষণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকও এসডিজি ১৫-এর সঙ্গে যুক্ত। গ্রামীণ বাংলাদেশে দরিদ্র পরিবারগুলো ঘরবাড়ি, বেড়া বা কৃষিকাঠামোর জন্য বারবার কাঠ সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়। যদি তারা সংরক্ষিত কাঠ বা বাঁশ ব্যবহার করতে পারে, তবে কাঠামোর আয়ুষ্কাল বাড়ে, ব্যয় কমে এবং বন থেকে অতিরিক্ত আহরণের প্রবণতা হ্রাস পায়। একই সঙ্গে এটি স্থানীয় পর্যায়ে বন সংরক্ষণের সচেতনতা তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক। তবে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণও জরুরি—সব ধরনের কাঠ সংরক্ষক রাসায়নিক পরিবেশবান্ধব নয়; অতীতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক মাটি ও পানিদূষণের ঝুঁকি তৈরি করেছে। তাই এসডিজি ১৫-এর আলোকে কাঠ সংরক্ষণ বলতে অবশ্যই পরিবেশসম্মত, নিয়ন্ত্রিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার বোঝাতে হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, কাঠ সংরক্ষণকে যদি শুধু একটি কারিগরি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, তবে তার প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এটি আসলে বন ব্যবস্থাপনার একটি কৌশল, যা সঠিক নীতি, গবেষণা ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এসডিজি-১৫ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে বন রক্ষার আলোচনায় কাঠ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা মানে—কম গাছ কেটে বেশি উপকার পাওয়া, আর সেটিই টেকসই উন্নয়নের মূল দর্শন।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের জাতীয় অঙ্গীকারের আলোকে কাঠ সংরক্ষণকে আর কোনোভাবেই প্রান্তিক বা কারিগরি বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে বনসম্পদ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন নিশ্চিত করার একটি কার্যকর হাতিয়ার। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত কাঠের আয়ুষ্কাল কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়; ফলে কম কাঠ আহরণ করেই দীর্ঘ সময়ের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বন উজাড় হ্রাস, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর।

সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতি, প্রযুক্তি ও সচেতনতার সমন্বিত অগ্রগতি প্রয়োজন। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ সংরক্ষণ উপকরণ ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মানসম্মত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং ব্যবহারকারী পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি—এসবই হতে হবে জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ। অতএব, কাঠ সংরক্ষণকে উন্নয়ন ভাবনার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এ খাত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্বশীল কাঠ ব্যবহার ও সংরক্ষণের চর্চাই আমাদের বন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, সহনশীল ও টেকসই বাংলাদেশ নির্মাণের ভিত্তি গড়ে দেবে।

লেখক: উপ-উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খুলনায় তারেক রহমানের সমাবেশে নেতাকর্মীদের ঢল

বিএনপির কাইয়ুমের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে নাহিদ ইসলামের রিট

ভারত ম্যাচ বয়কটে যেসব ক্ষতির মুখে পাকিস্তান

রাজধানীতে প্রাণ গেল পথচারীর

ভূমিকম্পে কাঁপল কাশ্মীর

ঋণখেলাপিদের জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে দিতে এসেছি : হাসনাত আবদুল্লাহ

এপেস্টাইন কেলেঙ্কারি, দল ছাড়লেন সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী

অভিনেতা সেন্টুর বাসায় ভাঙচুর

এনসিপির কার্যালয়ে হামলা, আহত ১

এক্স অ্যাকাউন্ট কারা হ্যাক করেছে, জানালেন জামায়াত আমির

১০

আজ থেকে নতুন দামে স্বর্ণ বিক্রি শুরু, ভরি কত

১১

পূর্বাচল প্লট দুর্নীতি : / শেখ হাসিনা-টিউলিপসহ ১৮ জনের রায় আজ

১২

মেহেরপুর / ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধা নিচ্ছেন না কারাবন্দি আ.লীগের নেতারা

১৩

তুরস্কে পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬

১৪

আসছে শৈত্যপ্রবাহ, তাপমাত্রা নামতে পারে ৮ ডিগ্রিতে

১৫

সংকট ও সৃজনশীলতা : গাজার তরুণদের বেঁচে থাকার লড়াই

১৬

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন স্বতন্ত্র প্রার্থী

১৭

অনার্স ভর্তি আবেদনের সময় বাড়াল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

১৮

সেনাবাহিনীর অভিযানে দুই মাদক ব্যবসায়ী আটক

১৯

ভারত ম্যাচ বয়কটে কী শাস্তি পেতে পারে পাকিস্তান 

২০
X