

ইসরায়েলের অব্যাহত অবরোধ, বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কারণে ভেঙে পড়েছে গাজার অর্থনীতি। এর ফলে গাজায় জীবিকা নির্বাহ এখন প্রতিদিনের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবকাঠামো ধ্বংস ও উৎপাদনশীল খাতগুলো অচল হয়ে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে বাসিন্দাদের বাধ্য হয়ে অনিশ্চিত ও অপ্রচলিত উপায়ে জীবনধারণ করতে হচ্ছে।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বিধ্বস্ত গাজায় তরুণদের টিকে থাকার লড়াইয়ের গল্প তুলে আনা হয়েছে।
২৪ বছর বয়সী হালা মোহাম্মদ আল-মাগরাবি গাজার এক শিক্ষিত তরুণ। তার উচ্চতর ডিগ্রি থাকলেও মিলছে না আর স্থিতিশীল জীবনের নিশ্চয়তা। ২০২৩ সালে নার্সিংয়ে স্নাতক শেষ করার পর তিনি দুই বছর স্বাস্থ্য খাতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। একদিন বেতনে চাকরি মিলবে এমন আশায় ছিলেন তিনি, কিন্তু সে সুযোগ আর আসেনি।
তিনি বলেন, স্বেচ্ছাসেবী কাজ দিয়ে সংসার চলে না। নিত্যপণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে, স্থায়ী আয় নেই। এভাবে ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
গাজার চাপে থাকা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সম্ভাবনা না দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের পেশা ছেড়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি অনলাইনভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ও ই-কমার্সে যুক্ত হন। তিনি জানান, হাসপাতালের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তিনি ডিজাইন কোর্স করেছিলেন, কিন্তু কাজ বা ক্লায়েন্ট পাননি। এরপর নিজেকে তুলে ধরার জন্য মার্কেটিং শেখার সিদ্ধান্ত নেন। অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্সে কাজ শুরু করেন।
আল-মাগরাবি বলেন, এটা আমার পড়াশোনা বা পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তবু আয় সীমিত হলেও এতে দৈনন্দিন খরচ চালানো যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, আল-মাগরাবির গল্প গাজার বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন। একের পর এক সংকটে গাজায় বেকারত্ব রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় মোট বেকারত্বের হার ৬৯ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এ হার প্রায় ৮০ শতাংশ। এছাড়া ৩০ বছরের নিচে জনগোষ্ঠী গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষই চরম অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। অঞ্চলটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় পাস তরুণ-তরুণী যোগ্য কাজ পাচ্ছেন না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে গাজার জিডিপি ৮২ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে। এছাড়া খাদ্যসংকট ও আয়ের উৎস হারানোর কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
গাজার এ পরিস্থিতিতে কেবল কর্মীরা নন, ব্যবসায়ীরাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মোহাম্মদ আল-হাজ গাজার এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী। তিনি আগে সাধারণ বাণিজ্য ও খাদ্য সরবরাহের ব্যবসা করতেন। কিন্তু যুদ্ধের পর তার সবকিছু হারান। তিনি বলেন, আমার গুদাম ও পণ্য ধ্বংস হয়ে গেছে। আমদানি খরচ ও লাইসেন্স ফি বহন করার সামর্থ্যও আর নেই। বছরের পর বছর গড়ে তোলা সবকিছু এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।
তিনি জানান, কোনো উপায় না পেয়ে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিজের বাড়ির একটি অংশ ইন্টারনেট সংযোগসহ ছোট কর্মস্থলে রূপান্তর করেছেন। বলেন, সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই উদ্যোগ নিয়েছি। ছাত্র ও প্রকৌশলীদের অনলাইনে পরীক্ষা বা কাজের জন্য স্থিতিশীল জায়গা দরকার ছিল। এটা তাদের জন্যও সমাধান, আমার জন্যও।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় যখন প্রচলিত চাকরির কাঠামো ভেঙে পড়ছে, তখন উদ্ভাবন বিলাসিতা নয়, বরং এটি প্রয়োজন হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সংকট থেকে বেরোতে গিয়ে এমন সমাধান খুঁজে পাচ্ছেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও চালু রাখছে। আবু জায়েদ জেনারেল ট্রেডিংয়ের সিইও আহমেদ ফারেস আবু জায়েদ জানান, যুদ্ধ শুরু হলে তার বিদ্যুৎ উৎপাদনভিত্তিক ছোট ব্যবসা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটর চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
এমন পরিস্থিতিতে পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে বিকল্প খোঁজেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি পদ্ধতি তৈরি করেন। তিনি বলেন, আমরা ভাবলাম, আশপাশের বর্জ্য কীভাবে জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়। প্লাস্টিকের টুকরো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা শুরু করি। অভিজ্ঞতাটি কঠিন ছিল, কিন্তু প্রয়োজন আর সৃজনশীলতা থেকেই এসেছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও ব্যবসা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মারাম আল-ক্বারা বলেন, এমন উদ্যোগ গাজার শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গাজার সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়, বরং এমন অর্থনৈতিক পরিবেশের অভাব, যা সেই প্রতিভাকে কাজে লাগাতে পারে। ছোট প্রকল্পও সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। যখন প্রচলিত চাকরি নেই, তখন অপেক্ষা না করে সুযোগ তৈরি করাই উদ্ভাবন।
আলজাজিরা জানিয়েছে, গাজায় এখন অনেক শিক্ষিত তরুণ যেমন ডাক্তার, প্রকৌশলী, নার্সরাও রাস্তায় বোতলজাত পানি, সবজি বা পুরনো কাপড় বিক্রি করছেন। এগুলো উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন নয়, বরং বেঁচে থাকার কৌশল। এক তরুণ জানান, আমাদের বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই।
তবে উপত্যকায় রয়েছে ভিন্ন চিত্রও। চরম সংকটের সুযোগ নিয়ে শোষণও বাড়ছে। মাহমুদ নামে এক যুবক জানান, চাকরি ও সামাজিক সুরক্ষা না থাকায় অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। নিয়মিত আয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে অবৈধ বা শোষণমূলক পথে যাচ্ছে।
তিনি জানান, অর্থ ধার দেওয়া, মুদ্রা লেনদেন ও শোষণমূলক আর্থিক লেনদেন বেড়েছে। অনেক সময় প্রবাসী আয়ের টাকা নগদ তুলতে গিয়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি ছাড় দিতে হচ্ছে।
এমন সব পরিস্থিতির মধ্যেও আশার উদাহরণও আছে। আবু জায়েদের বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু সমস্যার সমাধান করেনি, বরং বহু তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এটা শুধু বিদ্যুৎ দেয়নি। উৎপাদন, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে ডজনখানেক তরুণের কাজ ও দক্ষতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও একটি ছোট ধারণা টেকসই উদ্যোগে রূপ নিতে পারে। এতে করে সমাজ উপযোগিতা পায় এবং উৎপাদনশীলতার অনুভূতি ফিরে আসে।
মন্তব্য করুন