মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

দারিদ্র্য বিমোচনে তথ্যপ্রযুক্তি

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়নের চরম উৎকর্ষের ফলে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (ICT) অভাবনীয় ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকা এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার হলো তথ্য। পৃথিবীতে এখন যার কাছে যত বেশি সঠিক তথ্য থাকবে, সে তত বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচিত হবে। জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ সবক্ষেত্রেই তথ্যের অবাধ প্রবাহ এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের চারপাশের পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর অবস্থা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং শিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে তথ্য জানা এখন বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি। যদি তথ্যের এ নিরন্তর প্রবাহ কোনো কারণে থমকে যায়, তবে আধুনিক সভ্যতার পক্ষে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। পরিবেশগত বিপর্যয় বা বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য পাওয়া জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। তাই প্রযুক্তি যে তথ্য সরবরাহ করে, তা আধুনিক মানুষের জন্য অমূল্য সম্পদ।

কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট হলো তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির প্রধান দুটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এ দুটি উপাদানের সমন্বয়ে পৃথিবী এখন একটি বৈশ্বিক গ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। ফলে ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে পুরো পৃথিবী এখন মানুষের আঙুলের মুঠোয় চলে এসেছে। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক মুক্তি এবং অবকাঠামোগত উন্নতিতে এ প্রযুক্তি এখন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, যা একসময় অকল্পনীয় ছিল।

দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব দূরীকরণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রচলিত পুথিগত বিদ্যার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। দেশের তরুণ প্রজন্ম যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং ডেটা সায়েন্সের মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারে, তবে তাদের কর্মসংস্থানের জন্য শুধু দেশীয় বাজারের ওপর নির্ভর করতে হবে না। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে তারা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স আনতে সক্ষম হবে।

প্রযুক্তির উন্নয়ন মানে একটি দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারদের মুখে হাসি ফোটায়। জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে প্রযুক্তির বিকল্প নেই।

তথ্যপ্রযুক্তি শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি করে না, বরং এটি নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এখন একজন তরুণ অল্প পুঁজিতে ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিজের ব্যবসা শুরু করতে পারে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে সারা বিশ্বে। এ উদ্যোক্তা সংস্কৃতি দারিদ্র্য বিমোচনের একটি টেকসই মডেল। যখন একজন ব্যক্তি নিজে স্বাবলম্বী হন এবং আরও কয়েকজনের কাজের ব্যবস্থা করেন, তখন সমাজ থেকে বেকারত্বের অভিশাপ দ্রুত দূর হয়।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের জন্য আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিং দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশের কাজ ঘরে বসে করার সুযোগ এখন অবারিত। এর ফলে গ্রামীণ জনপদের শিক্ষিত তরুণরাও এখন হাজার হাজার ডলার আয় করছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত দারিদ্র্য দূর করছে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও সহায়ক হচ্ছে। প্রযুক্তির এ সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারলে সমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।

প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে শহর ও গ্রামের মধ্যে থাকা ডিজিটাল বৈষম্য বা ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ দূর করা প্রয়োজন। উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম যদি শুধু শহরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কোনো লাভ হবে না। সরকারকে তৃণমূল পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমানো এবং সহজলভ্য করার দিকে নজর দিতে হবে। প্রান্তিক মানুষ যখন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হবে, তখনই প্রকৃত অর্থে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

দুর্নীতি দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবাগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা লেনদেন এবং ই-গভর্ন্যান্সের ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমছে। এর ফলে দরিদ্র মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ও সরকারি সহায়তা সরাসরি পাচ্ছে। সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে সরকারি সম্পদের সঠিক বণ্টন হবে, যা পরোক্ষভাবে বেকারত্ব দূর করতে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত মজবুত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের এ সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানুষের কর্মসংস্থানের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনছে। অনেক প্রথাগত কাজ বিলুপ্ত হলেও ডেটা এনোটেশন, এআই ট্রেনিং এবং অটোমেশন ম্যানেজমেন্টের মতো লাখ লাখ নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। দেশের তরুণদের যদি দ্রুত এই উদীয়মান প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা যায়, তবে তারা বৈশ্বিক চাকরির বাজারে নেতৃত্ব দিতে পারবে। এ প্রযুক্তিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারাটাই হবে দারিদ্র্য বিমোচনের পরবর্তী ঢাল। মেধার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটলে বেকারত্ব দূরীকরণ শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগই একটি দেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারি, তবে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব জাদুঘরে চলে যাবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে প্রযুক্তিবান্ধব একটি সমাজ গঠন করা, যেখানে মেধা ও সুযোগের সঠিক সমন্বয় ঘটবে।

মো. নূর হামজা পিয়াস, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খুলনায় তারেক রহমানের সমাবেশে নেতাকর্মীদের ঢল

বিএনপির কাইয়ুমের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে নাহিদ ইসলামের রিট

ভারত ম্যাচ বয়কটে যেসব ক্ষতির মুখে পাকিস্তান

রাজধানীতে প্রাণ গেল পথচারীর

ভূমিকম্পে কাঁপল কাশ্মীর

ঋণখেলাপিদের জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে দিতে এসেছি : হাসনাত আবদুল্লাহ

এপেস্টাইন কেলেঙ্কারি, দল ছাড়লেন সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী

অভিনেতা সেন্টুর বাসায় ভাঙচুর

এনসিপির কার্যালয়ে হামলা, আহত ১

এক্স অ্যাকাউন্ট কারা হ্যাক করেছে, জানালেন জামায়াত আমির

১০

আজ থেকে নতুন দামে স্বর্ণ বিক্রি শুরু, ভরি কত

১১

পূর্বাচল প্লট দুর্নীতি : / শেখ হাসিনা-টিউলিপসহ ১৮ জনের রায় আজ

১২

মেহেরপুর / ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধা নিচ্ছেন না কারাবন্দি আ.লীগের নেতারা

১৩

তুরস্কে পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬

১৪

আসছে শৈত্যপ্রবাহ, তাপমাত্রা নামতে পারে ৮ ডিগ্রিতে

১৫

সংকট ও সৃজনশীলতা : গাজার তরুণদের বেঁচে থাকার লড়াই

১৬

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন স্বতন্ত্র প্রার্থী

১৭

অনার্স ভর্তি আবেদনের সময় বাড়াল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

১৮

সেনাবাহিনীর অভিযানে দুই মাদক ব্যবসায়ী আটক

১৯

ভারত ম্যাচ বয়কটে কী শাস্তি পেতে পারে পাকিস্তান 

২০
X