মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
এস আই শরীফ
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাদামাটা কথা

হামে হাবুডুবু: স্বাস্থ্য খাতই যেন অস্বাস্থ্যকর!

হামে হাবুডুবু: স্বাস্থ্য খাতই যেন অস্বাস্থ্যকর!

দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাম্প্রতিক সংকট কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়—এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার সম্মিলিত প্রতিফলন। হামের প্রাদুর্ভাব এবং একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনা সেই গভীর সংকটকে উন্মোচন করেছে; যা বেশ কিছুদিন ধরে জমে উঠছিল। খুব দৃঢ়ভাবেই বলা যায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্বাস্থ্য খাতে যে শৈথিল্য ও ভুল সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি, তারই ফলাফল আজকের এ বিপর্যয়।

হাম প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ। কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি থাকলে এর বিস্তার সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বাংলাদেশ অতীতে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে বিশ্বে সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের নীতিনির্ধারকরা। টিকার জন্য প্রয়োজনীয় ১ হাজার ৩৮ কোটি টাকার পরিবর্তে মাত্র ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া—এটি শুধু একটি আর্থিক ঘাটতি নয়, বরং এটি একটি নীতিগত ব্যর্থতা; যা জনস্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আসলে একটি ‘সিস্টেম ফেইলিওর’-এর ফল। গত এক বছরে স্বাস্থ্য খাতে যে অস্থিরতা বিরাজ করেছে, তা শুধু টিকাদান কর্মসূচিকে দুর্বল করেনি, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। কর্মসূচির স্থবিরতা, টিকার সংকট, মাঠপর্যায়ে জনবলের অভাব—সব মিলিয়ে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যার মোকাবিলায় প্রয়োজন ছিল দূরদর্শী নেতৃত্ব ও দ্রুত পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ঠিক তার উল্টো চিত্র।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানুয়ারিতে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সতর্ক করেছিল। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত; যা যথাসময়ে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হলে আজকের পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো যেত। কিন্তু তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সে সতর্কবার্তাকে আমলে নেয়নি। এ অবহেলা এখন প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর খাতে এমন অবজ্ঞা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নৈতিক দায়ও বহন করে। স্বাস্থ্য খাতে চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—জবাবদিহি। একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে কোনোভাবেই ‘দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে তার সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। এটি ব্যক্তি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্যও অপরিহার্য।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য খাতে এক ধরনের ‘স্টিমরোলার’ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা না করে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়েছে। এর ফলে ছোট ছোট সমস্যাও বড় আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ক্রমেই কমে গেছে। ফলে আজকের মতো একটি সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাত প্রস্তুত ছিল না। আরেকটি বড় সমস্যা হলো—অবকাঠামোর অকার্যকারিতা। দেশে বিপুলসংখ্যক আইসিইউ, অক্সিজেন জেনারেটর এবং অক্সিমিটার থাকা সত্ত্বেও সেগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে জনবলের অভাবে। এটি একটি চরম দৃষ্টান্ত যে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হয় না, তা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলও প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যা ছিল, কিন্তু তা সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে এখন সংকটের সময়ে এ দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একটি ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা। এটি সহজ কাজ নয়, তবে সঠিক পরিকল্পনা ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে তা সম্ভব।

প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করে টিকার সরবরাহ চেইনকে শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। পাশাপাশি, মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এরই মধ্যে সরকার দ্রুততার সঙ্গে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে, যা নিঃসন্দেহে দারুণ পদক্ষেপ।

দ্বিতীয়ত, জনবল সংকট দূর করণে নিতে হবে বিশেষ পরিকল্পনা। দ্রুত প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু নিয়োগ দিলেই হবে না, তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও প্রণোদনাও নিশ্চিত করতে হবে যেন তারা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন। এক কথায়, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে; যা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে দেখা যায়। প্রতিটি এলাকার জন্য নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্য রেকর্ড তৈরি করাও জরুরি।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা; যেসব আইসিইউ, অক্সিজেন জেনারেটর এবং অন্যান্য সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়ে আছে, সেগুলো দ্রুত মেরামত ও সচল করতে হবে। পাশাপাশি এসব সরঞ্জাম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

চতুর্থত, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া; রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সময়মতো তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এর জন্য একটি আধুনিক ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের সতর্কবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে।

ষষ্ঠত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা; টিকাদান সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগাত হবে। অনেক ক্ষেত্রে গুজব ও ভুল তথ্য টিকাদান কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে, সেগুলো মোকাবিলায় কার্যকর প্রচার চালাতে হবে।

আরও দুটি দেশের উদাহরণ সামনে আনা যেতে পারে। রুয়ান্ডার মতো কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মী ব্যবস্থা চালু করা। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হলে তা অনেক বেশি কার্যকর হবে। আর দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল অনুসরণ করে একটি আধুনিক ডিজিটাল স্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে সবচেয়ে ভালো হয়। এতে রোগের প্রাদুর্ভাব দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

একটা বিষয় স্পষ্ট, স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রয়োজন। এটি কেবল একটি সংকট মোকাবিলা নয়; বরং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলারও দরকার। এজন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে স্বাস্থ্য খাতের সব দিক—অর্থায়ন, জনবল, অবকাঠামো, প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হবে। একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করে তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সরকার পরিবর্তন হলেও স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি তাতে থমকে যাবে না।

হামের প্রাদুর্ভাব আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, কিন্তু একই সঙ্গে একটি সুযোগও। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আন্তর্জাতিক সেরা উদাহরণগুলো অনুসরণ করা যায়, তাহলে একটি শক্তিশালী, টেকসই ও জনগণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক সিদ্ধান্ত এবং তা বাস্তবায়নের দৃঢ়তা। আশা করি, বর্তমান সরকার সে কাজটি করার পথেই পা বাড়াবে।

একটা কৌতুক দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। পেটে ভীষণ ব্যথা নিয়ে এক রোগী কাতরাতে কাতরাতে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার রোগীর অবস্থা দেখে বলল, কী হয়েছে আপনার। রোগীর উত্তর, পেটে ভীষণ ব্যথা হচ্ছে ডাক্তার সাহেব। ডাক্তার তার পেট পরীক্ষার পর বলল, আপনার পায়খানা কেমন? রোগী জবাব দিল—গরিব মানুষ আমি, পায়খানা আর কেমন হবে! তিন পাশে বেড়া আর সামনে চটের বস্তা কেটে পর্দা দেওয়া!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক কালবেলা

মেইল: [email protected]

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হার্ট ভালো রাখতে প্রতিদিন খাবেন যে পাঁচ খাবার

৩৪ তলার ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

১০

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১১

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১২

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১৩

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৪

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১৫

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৬

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৭

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৮

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৯

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

২০
X