

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা বাংলা প্রবাদ ‘প্রদীপের নিচে অন্ধকার’কে স্মরণ করিয়ে দেয়। শ্রম অধিদপ্তরের অধীন এ কেন্দ্রের লক্ষ্য শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটির নিজেরই এখন রুগ্ণদশা।
মঙ্গলবার কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের বর্তমান জরাজীর্ণ দশা এবং অবহেলার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে কামারপাড়া রোডের মুখে প্রায় তিন বিঘা মূল্যবান সরকারি জমির ওপর নির্মিত কেন্দ্রটির বড় একটি অংশ পরিত্যক্ত এবং জরাজীর্ণ। শ্রমিকদের কল্যাণে কেন্দ্রটি সরব থাকার কথা থাকলেও এর একটি অংশ মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, টঙ্গীর মতো একটি বিশাল শিল্পাঞ্চলের লাখ লাখ শ্রমিকের জন্য বরাদ্দকৃত প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মাত্র ১১ জন জনবল নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলছে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের অভাবে মূল ভবনটি ব্যবহারের যোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এখন পরিচালনা করতে হচ্ছে অলিম্পিয়া রোড এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে। নিজস্ব তিন বিঘা জমি এবং কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো থাকতেও কেন প্রতি মাসে ভাড়ার টাকা অপচয় করে কার্যক্রম চালাতে হবে, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিটির বর্তমান বাজারদর ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এত বিপুল মূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদকে চার দশক ধরে অরক্ষিত ও সংস্কারহীন অবস্থায় ফেলে রাখা প্রশাসনিক চরম উদাসীনতা ও জবাবদিহির অভাবকেই স্পষ্ট করে তোলে।
নিরাপত্তা প্রহরীর অভাব এবং সীমানাপ্রাচীর অরক্ষিত থাকায় এ বিশাল সরকারি সম্পত্তি যে কোনো সময় বেদখল বা অসাধু চক্রের গ্রাস হতে পারে, সে আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর পরিত্যক্ত ভবনগুলোয় অসামাজিক কার্যক্রম চলায় স্থানীয়দের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন পাঠানো হলেও তা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। যদিও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আশ্বস্ত করেছেন যে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এ ‘বিবেচনা’র শেষ কোথায়? কেন একটি জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ফাইল বছরের পর বছর আটকে থাকবে?
আমরা মনে করি, প্রতিষ্ঠানটির এ বেহাল অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে এ মূল্যবান সরকারি সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ জরিপ করে এর সীমানা প্রাচীর সংস্কার, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। শ্রমিকদের ঘামে-শ্রমে সচল থাকা এ দেশে তাদের কল্যাণের জন্য বরাদ্দকৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া নির্ঘাত অন্যায়। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। সুতরাং অব্যবহৃত ভবনগুলো সংস্কার করে সব ধরনের সেবা নিশ্চিতে সমর্থ হয়—এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগই হতে পারে সময়োপযোগী। এতে সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরাও সরাসরি উপকৃত হবেন। আমাদের প্রত্যাশা, সরকারসংশ্লিষ্টরা দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেবে।