মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩
ড. রাধেশ্যাম সরকার
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

চাই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার বাজেট

চাই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার বাজেট

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উত্থাপন করা হয়েছে। বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। নিঃসন্দেহে এটি একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট। তবে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেই যে জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বর্তমানে অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। তাই এবারের বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং উৎপাদনশীল খাতকে শক্তিশালী করা। বিশেষ করে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুৎপাদনশীল ব্যয় কমানো এবং সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান বৃদ্ধি জরুরি। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দারিদ্র্য হ্রাস, টেকসই প্রবৃদ্ধি কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতার কোনো লক্ষ্যই দীর্ঘ মেয়াদে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই নতুন বাজেটকে শুধু আয় ও ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি কার্যকর নীতিপত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি। চলতি ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনেক কম। বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ৪ শতাংশ এবং আইএমএফ ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা, বিনিয়োগের ধীরগতি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং উৎপাদন খাতে স্থবিরতা এই নিম্ন প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আইএমএফও উল্লেখ করেছে যে, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। অর্থবছরের শেষভাগে হাওর অঞ্চলে অকাল বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধানের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্মসংস্থান কমেছে, মানুষের আয় হ্রাস পেয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যদি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ। কারণ কৃষি দুর্বল হলে সামগ্রিক অর্থনীতিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

চলতি অর্থবছরে কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৬ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়, যার মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ২৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, যা মোট বরাদ্দের বড় অংশ। অবশিষ্ট অর্থ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বণ্টিত হয়েছে। অথচ কৃষি অর্থনীতির কাঠামোতে এখন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে; স্বাধীনতার পর কৃষি জিডিপিতে শস্য খাতের অংশ ছিল ৭৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে ৪৬ দশমিক ২২ শতাংশে নেমেছে, বিপরীতে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও বনজ খাতের অংশ ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাজেট বরাদ্দেও এ কাঠামোগত পরিবর্তনের যথাযথ প্রতিফলন থাকা জরুরি। মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন ঘটেছে, আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুধ, ডিম, মাংস ও মাছের চাহিদা বাড়ছে, তাই পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে কৃষি বাজেটকে শুধু শস্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের করে সমন্বিত কৃষি উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষি গবেষণায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ এখনো অত্যন্ত সীমিত, বর্তমানে কৃষি জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় হয়, যেখানে চীন, জাপান ও ভিয়েতনামের মতো দেশে এ হার ৩ থেকে ৫ শতাংশ। গবেষণা খাতে এই দুর্বলতা কৃষির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে বড় বাধা, কারণ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞানীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন ও পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা এবং অনুপ্রেরণার ঘাটতির কারণে অনেক মেধাবী গবেষক বিদেশে চলে যাচ্ছেন বা পেশা পরিবর্তন করছেন; এ অবস্থায় কৃষি গবেষণায় অন্তত কৃষি জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি, যা টেকসই কৃষি উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে কৃষক উৎপাদনের ন্যায্য দাম পান না, অন্যদিকে ভোক্তাকে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হয়। বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের আধিপত্য এই বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। সরকারকে বাজারে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ উৎপাদন ব্যয় কমানো ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কার্যকর উপায়। অতীতে ভর্তুকি মূল্যে কৃষিযন্ত্র সরবরাহের উদ্যোগ অনিয়মের কারণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। তাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে এ কর্মসূচি ফের চালু করা দরকার। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা কৃষিকে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ কারণে জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ সহনশীল কৃষি এবং কৃষক সুরক্ষা তহবিলের জন্য বাজেটে পৃথক বরাদ্দ থাকা জরুরি। সর্বোপরি, আগামী বাজেটের সাফল্য তার আকারে নয়, বরং খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বিনিয়োগই টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। তাই আসন্ন বাজেটকে কৃষক, ভোক্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তার জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রকৃত জনকল্যাণমুখী বাজেট সেই বাজেট, যা কৃষিকে শক্তিশালী করে এবং সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে। তাই আজকের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি, চাই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার বাজেট।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আত্মঘাতী গোলে সমতায় ফিরল বেলজিয়াম

৬০ বছরে এই প্রথম! বিশ্বকাপে বিরল ঘটনার জন্ম দিলেন স্পেনের তারকা ফরোয়ার্ড

কে এই ভোজিনহা? স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ নায়ক

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় নারায়ণগঞ্জে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা

দূরপাল্লার নিখুঁত শটে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মিসরের লিড

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, নাকি সংকটের পূর্বাভাস

এভাবেও হৃদয় জয়ের গল্প লেখা যায়

স্পেনকে রুখে দেওয়া কেপ ভার্দে আসলে কেমন দেশ?

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দিল কেপ ভার্দে

হবিগঞ্জে দুপক্ষের সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৪০

১০

রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী হাসপাতালে ভর্তি

১১

স্থানীয় সরকার নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে : মির্জা ফখরুল

১২

প্রথমার্ধে কেপ ভার্দের গোলকিপারের দৃঢ়তায় গোল পায়নি স্পেন

১৩

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ১০ কিলোমিটার যানজট

১৪

বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক : কারও কাছে আশীর্বাদ, কারও কাছে অভিশাপ

১৫

আইএটি-বুয়েটের ‘এআই যুগে শিক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন’ বিষয়ক সেমিনার

১৬

বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিনামূল্যে স্পোর্টস মেডিসিন বোর্ড কনসালটেশন গঠন

১৭

শিক্ষা অফিসারদের গাফিলতিতে অনুদান থেকে বঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীরা

১৮

সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেননি মোজতবা খামেনি, কী বলছে যুক্তরাষ্ট্র

১৯

দাস বাণিজ্যের রুট থেকে বিশ্বকাপের মহামঞ্চে কেপ ভার্দের অভিষেক

২০
X