

নরসিংদীতে শিক্ষা কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার অভাবে সরকারের আর্থিক অনুদান কর্মসূচি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন অসচ্ছল, মেধাবী এবং দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বহু শিক্ষার্থী। জেলার জন্য নির্ধারিত অনুদানের বিপরীতে আবেদনকারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতায় নরসিংদী জেলায় মোট ৭২ জন শিক্ষার্থী অনুদান পাওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ২৪ জন, নবম ও দশম শ্রেণিতে ১৮ জন, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ১৮ জন এবং স্নাতক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ে ১২ জন শিক্ষার্থী অনুদান পাবেন। কিন্তু জেলার ৩১৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেছেন।
অন্যদিকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় মোট ১১৫ জন শিক্ষার্থী অনুদান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এবতেদায়ী পর্যায়ে ১৯ জন, দাখিল বা এসএসসি (ভোকেশনাল) পর্যায়ে ৫৯ জন, আলিম বা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পর্যায়ে ২৮ জন এবং ফাজিল, কামিল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পর্যায়ে ৯ জন শিক্ষার্থী অনুদান পাবেন। তবে জেলার ৯৪৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেছেন।
জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ৩টি উপজেলা থেকে আবেদন জমা পড়েছে। বাকি ৩টি উপজেলা থেকে কোনো আবেদনই করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদেরকে আবেদন সংক্রান্ত তথ্য জানানো হয়নি। ফলে অনেক যোগ্য শিক্ষার্থী আবেদন করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দুরারোগ্য ব্যাধি, দৈব দুর্ঘটনা এবং শিক্ষা ব্যয়ের জন্য সরকারি অনুদানের আবেদন করতে পারবেন—এ তথ্য অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জানতেন না। যথাযথ প্রচারণার অভাবে অনুদান পাওয়ার যোগ্য অনেক শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারেনি।
তারা আরও বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক কষ্টের মধ্যেও লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, আবার কেউ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব শিক্ষার্থীর জন্য সরকারের বিশেষ সহায়তা থাকলেও তথ্যের অভাবে তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নরসিংদী জেলার সম্পাদক হলধর দাস বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের গাফিলতির কারণেই অধিকাংশ যোগ্য শিক্ষার্থী আবেদন করতে পারেনি। তিনি জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে নির্ধারিত অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা পর্যায়ে প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবেদন করেছে। ফলে প্রকৃত যাচাই-বাছাই ছাড়াই আবেদনকারীদের অনুদান দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাক্তন শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীরা সরাসরি আবেদন করতে পারে না। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে এবং স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান প্রধান বা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াকে অতিরিক্ত ঝামেলা মনে করে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানাতেই অনীহা দেখান।
রায়পুরা উপজেলার সমাজসেবক তৌফিক খান বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও দায় রয়েছে। তারা যথাযথ তদারকি করলে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচারণা নিশ্চিত করলে আরও বেশি সংখ্যক যোগ্য শিক্ষার্থী আবেদন করার সুযোগ পেত।
জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সঙ্গে কথা হলে অনেকেই জানান, তারা অনুদান কর্মসূচি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানানো সম্ভব হয়নি এবং তাদের প্রতিষ্ঠান থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও সচেতন থাকার আশ্বাস দেন তারা।
এ বিষয়ে নরসিংদী জেলা শিক্ষা অফিসার এ.এস.এম. আব্দুল খালেক বলেন, অনুদানের জন্য আবেদন সংক্রান্ত চিঠি ও নির্দেশনা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে আবেদন শুরুর সময়ে সফটওয়্যারে কিছু সমস্যা থাকায় অনেকেই আবেদন করতে পারেননি। তিনি জানান, ভবিষ্যতে যাতে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা আরও সচেতন হন সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নরসিংদী জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বলেন, “বিষয়টি আমার জানা ছিল না। চাহিদার তুলনায় এত কম আবেদন হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, সরকারি ও বেসরকারি সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দুরারোগ্য ব্যাধি, দৈব দুর্ঘটনা ও শিক্ষা ব্যয়ের জন্য আর্থিক অনুদানের আবেদন করতে পারেন। দুস্থ, প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গ, অসহায়, রোগগ্রস্ত, দরিদ্র, মেধাবী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা প্রতি তিন বছর পরপর পুনরায় আবেদন করার সুযোগ পান।
অনুদানের আওতায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ৮ হাজার টাকা, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ৯ হাজার টাকা এবং স্নাতক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন।