

জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—কি না করে থাকেন মহসিন ভাই! দলের কোচের গাড়ি চালানো থেকে শুরু করে বর্তমানে হামজার বিশ্বস্ত বডিগার্ড, দল বিদেশে খেলতে গেলে সবার জন্য ‘দেশি’ খাবার রান্না করার কাজটাও করে থাকেন তিনি। পদবি ‘টিম স্টাফ’, কিন্তু বাস্তবে তিনি যেন পুরো দলের নীরব চালিকাশক্তি।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দল ভালো ফল করলেই মহসিনদের আর তেমন মূল্য থাকে না। এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে ভারতকে হারানোর পুরস্কার হিসেবে ফুটবল দল পেয়েছে দুই কোটি টাকা বোনাস। অথচ বোনাসের তালিকায় জায়গা হয়নি দলের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ মহসিনের। একইভাবে বঞ্চিত হয়েছেন ভিডিও অ্যানালিস্ট নাসিফ ইসলামও। যার বিশ্লেষণ ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই হেড কোচ ম্যাচ পরিকল্পনা সাজান। পুরো সময়ে দলের সঙ্গে থেকেও বোনাসের তালিকায় নাম ওঠেনি ২৩ সদস্যের বাইরে থাকা আল আমিন, সজীব, মোরশেদ, রহমত মিয়া ও পাপ্পু হোসাইনের। মহসিন ভাইয়ের সঙ্গে আমার দুটি বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশ দল যখন পাঁচতারকা হোটেলে অবস্থান করে, তখনো খেলোয়াড়দের ভরসা তার হাতের রান্না।
অনেকেই প্রথম দেখায় তাকে সহকারী কোচ ভেবে ভুল করেন। কারণ অনুশীলনের আগে সবার আগে বল, কুন, মার্কার কাঁধে তুলে নেওয়া, মাঠ সাজানো, প্র্যাকটিস ড্রিলের প্রস্তুতি—এসব দায়িত্ব প্রায়ই তাকে পালন করতে দেখা যায়। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ান কোচ ম্যান ইয়ং ক্যাংয়ের হাত ধরে জাতীয় ফুটবল দলের সঙ্গে তার কাজের শুরু। এরপর জার্মান কোচ অটো ফিস্টার, ইরাকি কোচ সামির শাকির এবং অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন; করে যাচ্ছেন এখনো। সব কোচের কাছেই তিনি ছিলেন ভীষণ প্রিয়। কোটান তো তাকে নিজের ছেলের মতোই দেখতেন। রান্না শেখা, গাড়ি চালানো—সবকিছুতেই কোটানের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা মহসিন আজও বহন করে চলেছেন।
এক বিদেশ সফরে বাফুফে কোটানকে জিজ্ঞেস করেছিল, দলে তার কয়জন টিম স্টাফ প্রয়োজন। উত্তরে কোটান বলেছিলেন—‘আমার কেবল মহসিনকে চাই’। পঞ্চম শ্রেণি পাস এই মানুষটি ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। অনেক সময় বিদেশি কোচের পাশে দাঁড়িয়ে ব্রিফিং বাংলায় অনুবাদ করে দেন খেলোয়াড়দের। বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে জরুরি সময়ে অভিজ্ঞতা থেকে ভারপ্রাপ্ত ফিজিওর দায়িত্বও নিতে দেখেছি তাকে। ২০০৫ সালে জাতীয় ক্রিকেট দলের কোচ ডেভ হোয়াটমোরের সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন মহসিন। কিন্তু ফুটবলপ্রেমী এই মানুষটি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তখন তার সামনে ছিল তিনটি পথ—হোয়াটমোরের সহকারী হওয়া, জাতীয় সংসদ ভবনের স্টাফ হওয়া, আর বাফুফেতে স্থায়ী চাকরি। মহসিন বেছে নিয়েছিলেন ফুটবলকে।
বাংলাদেশ ফুটবলের তিনটি বড় সাফল্যের সঙ্গে তার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে—১৯৯৯ সালে কাঠমান্ডু সাফ গেমসের স্বর্ণপদক, ২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা এবং ২০১০ এসএ গেমসের স্বর্ণ। এই সময়ে এমন সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ সত্যিই বিরল। সবচেয়ে বড় কথা, মাঠে বাংলাদেশের প্রতিটি মুভমেন্ট তিনি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন। প্রতিপক্ষ যখন গোলমুখে আক্রমণ করে, তার বুকের স্পন্দন যেন থেমে যায়। আর বাংলাদেশ যখন আক্রমণে ওঠে, তখন তার শরীর বিদ্যুতের মতো সাড়া দেয়। এটাই মহসিন ভাই। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দল ভালো ফল করলেই মহসিনের আর তেমন মূল্য থাকে না। দুই কোটি টাকা বোনাসের লম্বা তালিকায় জায়গা হয় না তার নাম। এই অবহেলা সত্যিই হতাশাজনক। কারণ ফুটবলের জয় শুধু মাঠের ১১ জনের নয়, পর্দার আড়ালে থাকা মহসিনদের ঘাম, ত্যাগ আর নিঃশব্দ ভালোবাসার ফসলই এসব সাফল্য।