

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী উত্তাপ। একের পর এক দল প্রকাশ করছে দলীয় প্রার্থীর তালিকা। পাশাপাশি আসন সমঝোতা ও জোট গঠনেও চলছে জোর তৎপরতা। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রস্তুতির দৌড়ে পিছিয়ে নেই ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা গণঅধিকার পরিষদও। দলটি এককভাবেই ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, পাশাপাশি সম্ভাব্য জোট বা আসন সমঝোতা নিয়ে কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একক নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, দলের নাম ও প্রতীকে নির্বাচন করেই গণঅধিকার পরিষদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করা সম্ভব। তৃণমূলের এমন চাওয়া বিবেচনায় রেখে তপশিল ঘোষণার পরেই একক বা আসন সমঝোতা— এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা।
গত জুলাই মাসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ৩৬ আসনসহ এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে গণঅধিকার পরিষদ। চলতি সপ্তাহে আরও অন্তত ১০০ আসনে প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। ধারাবাহিকভাবে ৩০০ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করতে চায় দলটি। গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র হাসান আল মামুন কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত এককভাবে নির্বাচন করা। দলের তৃণমূলের প্রত্যাশাও তাই। তাদের চাওয়াকে কেন্দ্র করেই আমরা আগাচ্ছি। তপশিল ঘোষণার আগে আমরা ধারাবাহিকভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করব।’
গত শনিবার রাজধানীর বাড্ডায় এলেন কমিউনিটি সেন্টারে জাতীয় নির্বাচনে দলীয় অবস্থান ও প্রার্থী চূড়ান্তকরণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়। সভায় গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা, মহানগর এবং অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, তৃণমূলের নেতাদের প্রায় সবাই সারা দেশে এককভাবে ট্রাক প্রতীকে নির্বাচনের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন।
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যমবিষয়ক সমন্বয়ক আবু হানিফ কালবেলাকে বলেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাওয়া—দল যেন এককভাবেই নির্বাচনে অংশ নেয়। তাদের মনে হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অনেক দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও দখলদারির অভিযোগ রয়েছে; ফলে দল যদি কারও সঙ্গে জোটে যায়, তবে সেই দায়ও নিতে হবে। মানুষের কাছে গণঅধিকার পরিষদ একটি ক্লিন ইমেজের (স্বচ্ছ ভাবমূর্তির) দল। তাহলে আমরা জোট করে কেন অন্যের দায় নেব? গণঅধিকার পরিষদ তরুণ নেতৃত্বের একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দল; মানুষ মনে করে ভবিষ্যতে দলটি রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারে। সুতরাং মানুষের চাওয়ার কথা চিন্তা করে সাময়িক সুবিধার জন্য নয়, ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এগোতে হবে।’
এদিকে প্রাথমিকভাবে যেসব আসনে বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে, সে তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের আসনে প্রার্থী দেয়নি দলটি। রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন আছে আসন দুটি যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী গণঅধিকার পরিষদের এই দুই নেতার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পটুয়াখালী-৩ আসনটি পটুয়াখালী জেলার দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনেই গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের বাড়ি। তাই জোট থেকে হোক কিংবা দল থেকে হোক এই আসন থেকেই নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন নুর। অন্যদিকে আসনটি ফাঁকা রেখেছে বিএনপি। তাই দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন উঠেছে শেষ মুহূর্তে বিএনপি-গণঅধিকার পরিষদ জোট হলে নুর হতে পারেন জোটের প্রার্থী।
একই আলোচনা আছে ঝিনাইদহ-২ (সদর ও হরিণাকুণ্ডু) আসন নিয়েও। গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানের এই আসনে বিএনপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেনি। এর আগে জনসংযোগ ও সাংগঠনিক কাজে রাশেদ খানকে সহযোগিতা করতে দলের নেতাকর্মীদের বিএনপির পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া গণঅধিকারের সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসানের আসনেও (ঠাকুরগাঁও-২) বিএনপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেনি। সমঝোতা হলে এ আসনও ছেড়ে দিতে পারে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, গণঅধিকার পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী জোট বা আসন সমঝোতা নিয়ে দুই দলের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও আলোচনা চলমান আছে। নির্বাচনের আগে আগে দর কষাকষির মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে সিদ্ধান্ত। গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, অন্যান্য দলের মতো এককভাবে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত জোট কিংবা আসন সমঝোতা হতে পারে। বিএনপি, জামায়াতসহ অন্য দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা চলমান আছে। তবে বিএনপির সঙ্গে সে আলোচনা এগিয়েছে।
যদিও দলটির অভ্যন্তরে কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে জোটে গেলে আসন ভাগাভাগিতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিএনপি কোনো আসনে ছাড় দিলেও যদি দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকে যান, তাহলে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীদের জন্য জয় পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মতে, যেসব আসনে বিএনপি শরিকদের জন্য ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে, সেসব জায়গায় দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তেমন সাড়া দিচ্ছেন না। বরং কিছু এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। এর মধ্যে অন্যতম উদাহরণ— পটুয়াখালীর গলাচিপায় বিএনপি নেতাকর্মীদের হাতে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা। সর্বশেষ গত ৬ নভেম্বর গলাচিপার চরকাজল ইউনিয়নের চরশিবা এলাকায় বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নারীসহ উভয়পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হন।
দলের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা কালবেলাকে বলেন, ‘গণঅধিকার পরিষদ যদি দুই-তিনটি আসনের জন্য বিএনপির সঙ্গে জোট করে সেক্ষেত্রে নিজস্ব রাজনীতি হারানোর পাশাপাশি সেই আসনগুলোও হারাতে পারে। বিএনপির প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বরং গণঅধিকার পরিষদ এককভাবে নির্বাচনে গেলে কয়েকটি আসনে জয়ের সম্ভাবনা আছে।’
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম সঙ্গী আমরা। একসঙ্গে নির্বাচন করার ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের সঙ্গেও আলোচনা আছে। এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হইনি। যেহেতু এখনো পর্যন্ত কারও সঙ্গে জোট বা আসন সমঝোতার সিদ্ধান্ত হয়নি, সেহেতু এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে।’
তৃণমূল এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রার্থীদের কথা শুনেছি, দিকনির্দেশনা দিয়েছি। তারা তাদের অবস্থান জানিয়েছেন। আমরা উচ্চতর পরিষদের সভায় সেসব আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেব।’
তবে এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন দলটির সভাপতি নুরুল হক নুর। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ আদেশের পর আমরা নতুন করে ভাবছি। কোনো দলের সঙ্গে সরাসরি জোট না করে কিছু আসনে আসন সমঝোতা করার কথা ভাবছি। একইসঙ্গে উচ্চকক্ষে যেহেতু পিআর থাকবে, সেজন্য ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়া হবে। তারপরও বৃহত্তর স্বার্থে যদি জোট হয় হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা ৩০০ আসনেই প্রার্থীদের পরিচিত করাতে চাই। তপশিলের পর জোট বা আসন সমঝোতার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’