

বিশ্বকাপ ইতিহাসে অসংখ্য স্মরণীয় পারফরম্যান্স রয়েছে। তবে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই প্রদর্শনীকে আজও অনেকেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচনা করেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোলের ম্যাচের মাত্র তিন দিন পর আবারও জাদু দেখান আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি। এবার প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী বেলজিয়াম। কিন্তু ম্যাচ শেষে মনে হয়েছিল, পুরো বেলজিয়াম দল যেন একজন ফুটবলারের বিপক্ষেই খেলছিল।
মেক্সিকো সিটির অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই সেমিফাইনালের প্রথমার্ধে গোল না হলেও ম্যারাডোনা বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, তিনি অন্য এক স্তরের ফুটবল খেলছেন। তার নিখুঁত পাস, অবিশ্বাস্য ড্রিবল এবং সৃজনশীলতা বারবার বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে বিভ্রান্ত করে তুলছিল।
ম্যারাডোনার সাবেক সতীর্থ হোর্হে ভালদানো পরে স্বীকার করেছিলেন, সেদিন তাদের অধিনায়ক যেন সবার চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে ছিলেন। তার ভাবনা ও ফুটবল বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তাল মেলানোই ছিল কঠিন।
প্রথমার্ধ শেষে ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ম্যারাডোনা। পরে নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, ম্যাচটি জিততে হলে দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে বলে মনে হয়েছিল তার।
দ্বিতীয়ার্ধের সপ্তম মিনিটে শুরু হয় ম্যারাডোনা শো। হোর্হে বুরুচাগার পাস ধরে বেলজিয়াম রক্ষণ ভেদ করে বাম পায়ে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলকে এগিয়ে দেন তিনি। গোলটি হওয়ার আগেই যেন বুঝে গিয়েছিলেন বল কোথায় আসবে।
তবে আসল বিস্ময় ছিল তার দ্বিতীয় গোলটি!
বেলজিয়ামের কয়েকজন ডিফেন্ডারকে একাই কাটিয়ে বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন ম্যারাডোনা। ড্রিবলের জাদুতে রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ দিশেহারা করে দেন তিনি। এক পর্যায়ে ডিফেন্ডার এরিক গেরেটস এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, নিজের বক্সেই ম্যারাডোনার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ভারসাম্য হারানোর উপক্রম হলেও দুর্দান্ত শক্তিতে নেওয়া শট ঠেকাতে পারেননি গোলরক্ষক জ্যঁ-মারি ফাফ। বল জড়িয়ে যায় জালে, আর কার্যত সেখানেই শেষ হয়ে যায় বেলজিয়ামের প্রতিরোধ।
ম্যারাডোনা পরে নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, অনেকেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা গোলের সঙ্গে এই গোলটির তুলনা করেন। কিন্তু তার মতে, বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলটি ছিল আরও বেশি নিখুঁত ও কঠিন।
ম্যাচের শেষ ২৫ মিনিটে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক যেন পুরো মাঠকে নিজের খেলার মঞ্চ বানিয়ে ফেলেছিলেন। একের পর এক ড্রিবল, পাস এবং কারিকুরিতে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখেন তিনি।
ম্যাচ শেষে বেলজিয়ামের মিডফিল্ডার এনজো শিফো স্বীকার করেছিলেন, ‘সে আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে।
আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচে ২-০ গোলের জয় পেয়ে ফাইনালে ওঠে। পরে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আলবিসেলেস্তেরা।
অনেক কিংবদন্তি ফুটবলার বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজেদের ছাপ রেখে গেছেন। কিন্তু ১৯৮৬ সালের সেই সেমিফাইনালে ম্যারাডোনা যা করেছিলেন, সেটি আজও ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য শিল্পকর্ম হয়ে আছে। সেদিন তিনি শুধু একটি ম্যাচ জেতেননি, ফুটবলকে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক নতুন উচ্চতায়।