

ধানমন্ডির শংকরে নীরবতা ভেঙে যায় বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে। দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট তখন ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও স্লোগানের ভয়াল শব্দে কেঁপে ওঠে। যে ভবন থেকে ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বাঙালির গান ও সংস্কৃতির চর্চা ছড়িয়েছে, সেই ভবন মুহূর্তেই রূপ নেয় ধ্বংসস্তূপে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ছায়ানট সূত্র জানায়, রাত দেড়টা থেকে আড়াইটার মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ জনের একটি দল পরিকল্পিতভাবে ভবনের নিচ থেকে শুরু করে প্রতিটি তলায় উঠে ভাঙচুর, আগুন ও লুটপাট চালায়। পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রথমে ভবনের পার্কিং লটে আগুন ধরানো হয়। এরপর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন কক্ষে হামলা চালানো হয়। মনিটরিং সিস্টেম, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা, স্পিকার, লাইট, ফ্যান—সব ভেঙে ফেলা হয়। অফিসকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষে থাকা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, নথি ও আসবাব তছনছ করে দেওয়া হয়।
সংগীতচর্চার কক্ষে তবলা, হারমোনিয়াম, তানপুরা, তালযন্ত্র ভাঙা ও পুড়িয়ে ফেলা হয়। তিনতলায় রাখা বইয়ের স্তূপে আগুন দেওয়া হয়। এখনো সেখানে ছাই ও পোড়া কাগজ পড়ে আছে। দেয়াল থেকে নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয় সনজীদা খাতুন ও কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিকৃতি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় হামলাকারীরা ‘নাস্তিক’ বলে গালি দেয়।
রমেশ চন্দ্র স্মৃতি মিলনায়তন, সভাপতির কক্ষ, সাধারণ সম্পাদকের কক্ষ, সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, এমনকি শৌচাগার পর্যন্ত ভাঙচুরের শিকার হয়। প্রত্যক্ষদর্শী শুভ বলেন, ‘হামলাকারীদের একটি অংশ শুধু লুটপাটেই ব্যস্ত ছিল। তারা ড্রয়ার ভেঙে টাকা-পয়সা খুঁজছিল।’ পুরো সময় হামলাকারীরা ‘ভারতের দালাল’, ‘ভাঙো’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’সহ নানা স্লোগান দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পুরো ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শুক্রবার সকাল থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ছায়ানট ভবনের সামনে ছুটে আসেন। অনেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধ, কেউ কেউ চোখ মুছছিলেন।
অভিভাবক খাদিজা আক্তার বলেন, ‘রাতে হামলার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছুই করল না। আমার সন্তানের স্কুলে তারা আগুন দিয়েছে।’ তিনি জানান, ধানমন্ডি থানার ওসিকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাননি। শিক্ষার্থী রিয়া মিত্র বলেন, ‘মিলনায়তনে আগুন দিয়েছে। আমি গান চর্চা করতাম, এখন পারব না। বিচার চাই।’ আশিকুল হোসেন জানায়, ‘হারমোনিয়াম ভেঙে দিয়েছে। সবাই কাঁদছিল। আমি কীভাবে এখন গান শিখব?’
অভিভাবক অপূর্ব দে বলেন, ‘হাদির হত্যার বিচার চাই। কিন্তু যারা ছায়ানটে হামলা করেছে, তারা কি হাদির চেতনাকে ধারণ করে?’ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর রাজধানীজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ। এ বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ছায়ানটে এ হামলার ঘটনা ঘটে। ধানমন্ডি থানার কর্মকর্তা মিথুন সিংহ জানান, রাত আড়াইটার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
রাত সাড়ে ৩টায় ছায়ানট কর্তৃপক্ষ জানায়, সংগঠনের সব কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। শুক্রবার বিকেলে ছায়ানট ভবনের সামনে গানে গানে প্রতিবাদ জানান শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীরা। তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘ওসমান হাদির খুনিদের বিচার চাই’, ‘ছায়ানটে হামলার বিচার চাই’।
সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ছায়ানট পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘সিসিটিভি দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে।’ তিনি বলেন, ‘এ হামলা শুধু ফৌজদারি অপরাধ নয়, সাংস্কৃতিক চেতনার বিরুদ্ধেও আঘাত।’
আসক ও উদীচী পৃথক বিবৃতিতে এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বিচারের দাবি জানিয়েছে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট বারবার আঘাত পেয়েছে; কিন্তু কখনো থেমে যায়নি। এবারও তাদের কণ্ঠে শোনা গেল—‘ছায়ানট গাইবে, শেখাবে, বেঁচে থাকবে।’
ছায়ানট বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কোনো সরকার বা বিদেশি অনুদান নেয় না। নিজেদের অর্থে দ্রুত সংস্কার করবে। হামলার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি শোক প্রকাশ করেছে এবং দেশ-বিদেশ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা সব শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। ছায়ানট তার সংগীত সংস্কৃতির কাজ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।