রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

সংকটে উত্তরের আলুচাষিরা

সার নিয়ে হাহাকার
সংকটে উত্তরের আলুচাষিরা

গত বছর আলু চাষ করে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছিলেন বাগমারা উপজেলার দেউলিয়া গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আলু লাগাবেন তিনি। তবে বিপত্তি বেধেছে সার নিয়ে। স্থানীয় অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টে ধরনা দিয়েও মিলছে না চাহিদামতো সার। ফলে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে রোপণ কার্যক্রম। শুধু হাবিবুর রহমানই নন, তার মতো উত্তরের ১৬ জেলার হাজার হাজার কৃষক আলু চাষের মৌসুমের শুরুতেই সার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, এক ধরনের মুনাফালোভী ডিলাররা রাতের অন্ধকারে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সার কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে ডিলার পয়েন্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সার মিলছে না। আবার কোথাও সার মিললেও একজন কৃষককে এক বা দুই বস্তার বেশি দেওয়া হচ্ছে না, যা আলু ও শীতকালীন সবজি চাষের জন্য একেবারেই অপ্রতুল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ টন। এর মধ্যে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ টন। চলতি মৌসুমে এই দুই বিভাগে ৩ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৮৪ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষের শুরুতে প্রয়োজন প্রায় দুই বস্তা (১০০ কেজি) এমওপি, এক বস্তা (৫০ কেজি) ডিএপি এবং এক বস্তা টিএসপি। তবে এর বিপরীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বরাদ্দ দিচ্ছে বিঘাপ্রতি মাত্র ২৩ দশমিক ১৫ কেজি এমওপি, ৩৬ কেজি ডিএপি ও ১ দশমিক ৩ কেজি টিএসপি, যা কৃষকদের মতে বাস্তব চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে—এমওপি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৫৫১ টন, ডিএপি ২৫ হাজার ২৮১ টন এবং টিএসপি ৯ হাজার ৫৭০ টন। আর চলতি ডিসেম্বর চার জেলায় ১৫ হাজার ৩৮০ টন এমওপি, ২৯ হাজার ৪৫০ টন ডিএপি এবং ৯ হাজার ৪৬৬ টন টিএসপি সার বরাদ্দ দেওয়া হবে।

রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) অনুমোদিত ডিলার পয়েন্টগুলোর সামনে সকাল থেকে কৃষকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।

বাগমারা উপজেলায় একটি ডিলার পয়েন্টে সারের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন দেউলিয়া গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার অন্তত ১৮ বস্তা সার দরকার। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু এখনো একটি বস্তাও পাইনি। সামনে কয়েকশ মানুষ।

একই চিত্র জয়পুরহাটের কালাই উপজেলাতেও। কৃষক নাইম ইসলাম জানান, ৫০ বস্তা সারের চাহিদার বিপরীতে ডিলাররা এক বা দুই বস্তার বেশি দিচ্ছেন না। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে জমিতে সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করা যাচ্ছে না।

বাগমারা উপজেলার বিএডিসি ডিলার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমার তিন ট্রাক সার পাওয়ার কথা, কিন্তু মাসের শুরুতে পাচ্ছি মাত্র এক ট্রাক। তাই কৃষক পাঁচ বস্তা চাইলে দিতে পারছি এক বস্তা। সার কম পেয়ে তারা পরদিন আবার সবাই আসে, তখন চাপ আরও বাড়ে।’

এদিকে সংকটের কারণে বিকল্প উৎস থেকে অতিরিক্ত দামে কৃষকরা সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানা গেছে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষক লুৎফর রহমান অভিযোগ করে বলেন, সরকারি দামে সার না পেয়ে তিনি বাইরে থেকে প্রতি বস্তা টিএসপি ও ডিএপি সার ১ হাজার ৭০০ টাকায় এবং এমওপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকায় কিনে জমিতে আলু লাগিয়েছেন। অথচ সরকার নির্ধারিত এমওপি সারের মূল্য ১ হাজার, ডিএপি ১ হাজার ৫০ এবং টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা।

অন্যদিকে সংকটের কারণে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে প্রয়োজনের চেয়ে কম সার দিয়ে আলু রোপণ করছেন। ফলে ফলন নিয়ে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলু চাষের শুরুতেই সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ না হলে গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে পুরো মৌসুমের ফলনে।

রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, যতটা সার দেওয়ার কথা, তার চেয়ে কম দিয়েই বীজ লাগাতে হয়েছে। এতে ফলন কম হবে এটা নিশ্চিত।

সম্প্রতি রাজশাহীর বাগমারায় উপজেলা কৃষি অফিস ও পুলিশের যৌথ অভিযানে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার বাড়ি থেকে ৪৪৪ বস্তা অবৈধভাবে মজুত করা সার জব্দ করা হয়। পরে সেগুলো সরকারি দামে কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাবিনা বেগম বলেন, সারের তেমন কোনো সংকট নেই। অনেক কৃষক প্রয়োজনের তিন থেকে চার গুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন। যেখানে জমিতে ৩০ থেকে ৩৫ কেজি সার ব্যবহার করা দরকার, সেখানে অনেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত প্রয়োগ করছেন। ডিএপি সারে ফসফেট উপাদান থাকায় অনেক ক্ষেত্রে আলাদা করে টিএসপি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। তবু কৃষকরা ডিএপি ও এমওপি একসঙ্গে ব্যবহার করছেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আজকের নামাজের সময়সূচি

গভীর রাতে হঠাৎ ক্ষুধা লাগলে কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন?

ডিজিটাল গণমাধ্যম অগ্রদূতের আত্মপ্রকাশ

মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদল নেতাদের ওপর ‘আ.লীগের’ হামলা, আহত ১৮

রাজনীতিতেই থাকতে চাই, চাকরি নয় : ছাত্রদল নেতার আবেগঘন স্ট্যাটাস

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশ / জিম্মায় নেওয়া চুরির মালামাল থানায় ফেরত দিলেন কর্মকর্তা

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকারদলীয় এমপিদের সভা অনুষ্ঠিত

সকাল ৯টার মধ্যে ১৮ জেলায় ঝড়ের আভাস

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের চালকসহ গ্রেপ্তার ৩ জনের জামিন

৩৫.৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড / সিলেটে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন

১০

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নাহিদ ইসলামের বৈঠক

১১

মধ্যরাতে দেশে পৌঁছাবে লেবাননে নিহত ২ বাংলাদেশির মরদেহ

১২

শেষ মুহূর্তে বড় ধাক্কা, আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের বিশ্বকাপ শেষ

১৩

বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩ অটোরিকশা যাত্রীর

১৪

রোগীকে আটকে ইনজেকশন পুশের টাকা দাবি, নার্সকে শোকজ  

১৫

গৃহকর্মী থেকে মন্ত্রী : কলিতা মাঝির উত্থানের গল্প

১৬

নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করল চসিক

১৭

এসএসসি পরীক্ষার্থীকে বলাৎকার, আ.লীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ২

১৮

তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

১৯

ব্রাজিলের সামনে এবার মিসর

২০
X