

টি-শার্ট আর জিন্স পরা এক যুবককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে নিউইয়র্ক পুলিশ। ট্যাক্সি শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নেমে তিনি আটক হন। ঘটনাটি চার বছর আগের হলেও সব সময়ের এই যোদ্ধা সর্বদা থাকেন শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে সোচ্চার। আর সেই শ্রমজীবীদের ভোট ও ভালোবাসায় গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে বাজিমাত করেছেন এই লড়াকু। তিনি আর কেউ নেন—জোহরান মামদানি। তার এই অভাবনীয় বিজয় কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের পুরো রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে চ্যালেঞ্জ করছে। যে কারণে তার সামনের পথ সরল হবে না।
শ্রমিক শ্রেণির জন্য লড়াই করা ৩৪ বছর বয়সী মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি প্রথম মুসলিম ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়রও।
মেয়র হওয়ার পথে মামদানির এ স্বপ্নযাত্রার পথ যেমন সহজ ছিল না, তেমনি সামনেও সরলরেখা হবে না। কারণ তিনি দেশটির শক্তিশালী ইহুদি লবি, ধনিকশ্রেণির বিরুদ্ধে প্রচার করে জয় পেয়েছেন। এমনকি স্বয়ং প্রেসিডেন্টও তার বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নেমেছিলেন। তিনি আগেই মামদানির প্রশাসনের জন্য সম্ভাব্য সরকারি তহবিল বন্ধেরও ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।
বিজয়ের পর বুধবার ব্রুকলিনে প্রথম ভাষণে মামদানি বলেছেন, ‘নিউইয়র্ক দেখিয়েছে—রাজনৈতিক অন্ধকারে আলোর ঝিলিক। আপনি যদি অভিবাসী হন, ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির হন বা অগণিত কৃষ্ণাঙ্গ নারীর একজন, যাকে ট্রাম্প ফেডারেল চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছেন; আপনি যদি কোনো একক মা হন, যিনি নিত্যপণ্যের দাম কমার অপেক্ষায় আছেন বা যে কেউ, যার পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে—আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব।’
নিজেকে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে প্রচার করা মামদানি এদিন ভেদাভেদ ও বিভাজনের রাজনীতি বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছেন। তবে তার এ পরিচয় নিয়ে ব্যাপক আপত্তি আছে ডানপন্থি রিপাবলিকানদের। তা সত্ত্বেও তিনি বামপন্থি বিষয়গুলোকে সগর্বে সামনে এনেছেন। শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, গণপরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও মুক্তবাজার ব্যবস্থায় সরকারি হস্তক্ষেপের মতো বিষয়গুলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে উল্লেখ করেছেন। সেগুলো এখন বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন তিনি।
তবে মামদানিকে এখন প্রত্যাশা ও সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়তে হবে। কারণ এরই মধ্যে নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট গভর্নর ক্যাথি হোচুল বলেছেন, মামদানির উচ্চাভিলাষী এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কর বৃদ্ধির বিরোধিতা করবেন তিনি এবং পর্যাপ্ত তহবিল থাকা সত্ত্বেও মামদানি এককভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না।
এতদিন ধরে করপোরেট ও অভিজাত ব্যবসায়ীরা নিউইয়র্কের ম্যানহাটনকে বিশ্বের আর্থিক রাজধানী বানিয়েছেন, সেই তাদের সমালোচক হলেও মেয়র মামদানিকে শান্তিপূর্ণভাবে শাসন করতে হলে তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ছাড় দিতে হবে।
গাজা যুদ্ধের জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছেন এবং নিউইয়র্কে এলে গ্রেপ্তার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মামদানি, যা বাস্তবায়নে সমস্যার সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে হুমকি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নেও বিপদ ডেকে আনবে এই নবনির্বাচিত মেয়রের।
এ ছাড়া মামদানিকে ডেমোক্র্যাটিক নেতাদের মন জয় করতেও চাপ দেওয়া হবে, যেমন নিউইয়র্কের সিনেটর ও সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার, যিনি কখনো তার প্রচারকে সমর্থন করেননি। তবে মামদানির সুবিধা হচ্ছে যে তার ওপর অতীতের তেমন বোঝা নেই, মানে তিনি আগে কখনো বড় দায়িত্ব পালন করেননি।
জানুয়ারিতে যখন মামদানি শপথ নেবেন, তখন শুরু থেকেই রাজনৈতিক খ্যাতি গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন এবং তার বিরোধিতা করলে ট্রাম্প কেবল মামদানির কাজের জন্য আরও বৃহত্তর প্ল্যাটফর্মই তৈরি করবেন।
এর মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন মামদানি। বুধবার তিনি তার ‘ট্রানজিশন টিম’ বা ক্ষমতা গ্রহণকারী দলের নাম ঘোষণা করেছেন। পাঁচ সদস্যের এ দলের সবাই নারী। এর নেতৃত্ব দেবেন লানা লেপোড। তিনি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কাজ করবেন। কো-চেয়ার হিসেবে থাকবেন নিউইয়র্কের সাবেক ফার্স্ট ডেপুটি মেয়র মারিয়া তোরেস-স্প্রিংগার। আরও আছেন নিউইয়র্কের ফেডারেল ট্রেড কমিশনের সাবেক প্রধান লিনা খান, ইউনাইটেড ওয়েজের প্রেসিডেন্ট ও সিইও গ্রেস বোনিয়া এবং সিটির স্বাস্থ্য ও মানবিক পরিষেবাবিষয়ক সাবেক ডেপুটি মেয়র মেলানি হারজোগ।
সংবাদ সম্মেলনে মামদানি বলেন, ‘আগামী মাসগুলোতে আমার দল ও আমি এমন একটি সিটি হল গড়ে তুলব, যেটি (আমাদের) নির্বাচনী প্রচারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সক্ষম হবে।’ সূত্র: বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান।