

রাজধানীর আফতাবনগরের বাসিন্দা ইফতেখার আহমেদ (৪২)। গুলশান-২ এলাকায় একটি তথ্য ও প্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে সম্প্রতি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। পরীক্ষায় দেখা যায়, তিনি উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এরপর থেকে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নিয়মিত চেকআপের জন্য হাসপাতালে এসে ইফতেখার বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই নানা সমস্যা ছিল, গুরুত্ব দিইনি। হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপ অনুভব করলে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে যাই। সেখানেই ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। ছয় মাস ধরে বারডেমে চিকিৎসা নিচ্ছি। আগের চেয়ে ভালো আছি, তবে নিয়ম মানতে না পারলে বিপদ হতে পারে।’
লালবাগের বাসিন্দা সামিয়া হকও ডায়াবেটিস আক্রান্ত হয়েছেন কিডনি জটিলতা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে। তিনি অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বারডেমে এসে সামিয়া বলেন, ‘কিডনি সমস্যার জন্য এসেছিলাম। চিকিৎসক প্রথমেই বলেন, ডায়াবেটিস থাকতে পারে। পরে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, আসলেই ডায়াবেটিস আছে। চিকিৎসক জানান, ডায়াবেটিস থেকেই কিডনি সমস্যা হয়েছে।’
এই দুটি ঘটনা আলাদা হলেও চিত্রটি সাধারণ। দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই একজন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অথবা উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন। ভয়ংকর বিষয় হলো, আক্রান্তদের অর্ধেকই জানেন না যে তারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন। এজন্য একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) ‘ডায়াবেটিস এটলাস ২০২৫’-এর তথ্যমতে, রোগীর সংখ্যায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সপ্তম স্থানে। দেশে এক কোটি ৩৮ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক চিকিৎসার আওতায় এসেছে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) মাধ্যমে।
ডায়াবেটিস শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যের নয়, দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘসময় বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রম কম হওয়া, মানসিক চাপ ইত্যাদি এই রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। আবার আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা হ্রাস পায়, কর্মক্ষমতা কমে যায়।
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে এ বছর বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে ‘কর্মস্থলে ডায়াবেটিস সচেতনতা গড়ে তুলুন’ প্রতিপাদ্যে দিবসটি। এ উপলক্ষে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বার্তা দিয়েছেন।
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কর্মক্ষেত্রে সচেতনতা নেই। অথচ এটা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ডায়াবেটিস প্রতিরোধে বাডাস কর্মক্ষেত্রে পাঁচটি করণীয় তুলে ধরেছে—১. বছরে অন্তত একবার কর্মীদের রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও বিএমআই নির্ণয়। ২. অফিস ক্যান্টিনে স্বাস্থ্যকর খাবার রাখা ও চা-কফিতে চিনির ব্যবহার কমানো। ৩. মানসিক চাপ কমাতে কাউন্সেলিং ও বিশ্রামের ব্যবস্থা।
৪. লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার ও কাজের ফাঁকে হেঁটে নেওয়ার অভ্যাস। ৫. ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও জীবনধারা বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ফাস্টফুড, চর্বিযুক্ত খাবার, মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনধারা ও শরীরচর্চার অভাব ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়ন্ত্রণে না থাকলে এই রোগ থেকে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, অন্ধত্ব এমনকি অঙ্গচ্ছেদের মতো ভয়াবহ জটিলতা দেখা দিতে পারে। সুশৃঙ্খল জীবন, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, ইনসুলিন ও ব্যায়ামের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আইডিএফ জানায়, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৫৯ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই প্রতিরোধযোগ্য। এখনই প্রতিরোধ না করা গেলে ২০৫০ সালে এই সংখ্যা ৮৫ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশে আক্রান্তদের অর্ধেকই নারী। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের ৬৫ শতাংশ ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। তাদের সন্তানদের মধ্যেও এ রোগের ঝুঁকি থাকে বেশি।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ২০৩০ সালের মধ্যে ৫টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—১. ৮০% রোগীকে শনাক্ত করা, ২. ৮০% রোগীর রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ৩. ৮০% রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা,
৪. ৬০% চল্লিশোর্ধ্ব রোগীকে ‘স্টাটিন’ সুবিধা দেওয়া, ৫. ১০০% টাইপ-১ রোগীর জন্য ইনসুলিন সহজপ্রাপ্য করা।
জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারার কারণে ডায়াবেটিস বাড়ছে। এর প্রভাব কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতাতেও পড়ছে। তাই কর্মস্থলে সচেতনতা তৈরি হলে রোগটি প্রতিরোধ সহজ হবে।’
ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন বলেন, ‘বিশ্বজুড়েই ডায়াবেটিস এখন মহামারি। রোগটির ভয়াবহতা থেকে আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে তা দেশের উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ১৪ নভেম্বর, যা ২০০৭ সাল থেকে জাতিসংঘের স্বীকৃত একটি দিবস। বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ এ দিবসটি ঘোষণা করে।
দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি গতকাল বারডেমে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। আজ শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে রোডশো, হ্রাসকৃত মূল্যে হার্ট ক্যাম্প, রক্তদান কর্মসূচি এবং আগামীকাল শনিবার বিনামূল্যে ডায়াবেটিস পরীক্ষা, প্রশ্নোত্তর পর্ব ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।