

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে ২০১৭ সালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নগরীর লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সাড়ে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় তখন ধরা হয় তিন হাজার ২৫০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ হয় ৩ বছর। প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে চলাচল করবে ৩৯ হাজার ৩৮৮টি গাড়ি। সেই ১৭ সাল পেরিয়ে ২৫ সাল এসেছে ঠিকই, তবে প্রকল্প এগোয়নি ঠিকঠাক। প্রতিদিন ‘প্রত্যাশিত’ ৩৯ হাজার গাড়ির বদলে গড়ে চলছে মাত্র ৮ হাজারের একটু বেশি, যা সম্ভাব্যতা যাছাইয়ের তুলনায় মাত্র ২০ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৯০ শতাংশ। কিন্তু ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। আর প্রকল্পের মেয়াদ তিন দফায় বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা এবং অপরিকল্পিত প্রকল্প হাতে নেওয়ার কারণেই এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে জনগণের কোনো কাজেই আসছে না। ফলে যানজট নিরসনের জন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হলেও এক্সপ্রেসওয়ে থাকছে ফাঁকা, কিন্তু নিচে যানজট লেগে থাকছে আগের মতোই। নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা, যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ঠিক করে আলোকায়নের ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে মানুষ এক্সপ্রেসওয়েমুখী হতে পারে বলে অভিমত তাদের। যদিও সিডিএ বলছে, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে প্রত্যাশিত গাড়ি চলাচল করবে।
গাড়ি চলছে কত, আয় হচ্ছে কত: সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে উদ্বোধনের পর সেই মাসে মোট গাড়ি চলেছিল ২ লাখ ৪ হাজার ৩৭টি। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার ২৩৪টি। এরপর মার্চে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৪২, এপ্রিলে ২ লাখ ৫২ হাজার ১৪৭, মে মাসে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩৯, জুনে ২ লাখ ৬০ হাজার ৫৭০, জুলাইয়ে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৩৬, আগস্টে ২ লাখ ৫৯ হাজার ১৬৪, সেপ্টেম্বরে ২ লাখ ৬২ হাজার ৭৮০ ও অক্টোবরে চলে ২ লাখ ৮০ হাজার ৯৩৯টি গাড়ি। গত ১০ মাসে মোট ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৭৮৮টি গাড়ি চলাচল করেছে। সে হিসাবে গড়ে দিনে চলেছে ৮ হাজার ১১৯টি গাড়ি।
গাড়ি চলাচলের ১০ মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চলেছে ২০ হাজার ৪০৬টি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫৬টি, কার ৮ লাখ ৭৪ হাজার ১২৫টি, জিপ ১ লাখ ৮০ হাজার ৩৬২টি, মাইক্রোবাস ৩ লাখ ৮৮৫টি, পিকআপ ৪৫ হাজার ১৯৯টি, মিনিবাস ২৭ হাজার ৯১৯টি, বড় বাস ৪ হাজার ৫০৬টি, চার চাকার ট্রাক ১৯ হাজার ৪৪৬টি, ৬ চাকার ট্রাক ১৪ হাজার ৯০৪টি ও কাভার্ডভ্যান চলেছে ৩ হাজার ৩৭৯টি।
এই যানবাহনগুলো থেকে মোট রাজস্ব আয় হয় ১৬ কোটি ৯৯ লাখ ৭৮০ টাকা। যেখানে জানুয়ারিতে আয় হয় ১ কোটি ৪৫ লাখ ৩১ হাজার ২৮০ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে আয় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩০ টাকা, মার্চে ১ কোটি ৩৭ লাখ ৬৩ হাজার ২৮০ টাকা, এপ্রিলে ১ কোটি ৭১ লাখ ১৩ হাজার ২২০ টাকা, মে মাসে ১ কোটি ৮০ লাখ ৯ হাজার ৭৯০ টাকা, জুন মাসে ১ কেটি ৬৯ লাখ ৮৪ হাজার ৪৫০ টাকা, জুলাই মাসে ১ কোটি ৮০ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪০ টাকা, আগস্টে ১ কোটি ৮১ লাখ ৬৪ হাজার ২৭০ টাকা, সেপ্টেম্বরে ১ কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার ২৮০ টাকা ও অক্টোবরে ১ কোটি ৯৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৪০ টাকা আয় হয়। সে হিসেবে দিনে গড়ে টোল আদায় হয় সাড়ে ৫ লাখ টাকার একটু বেশি। এ অবস্থা চলতে থাকলে নির্মাণব্যয় তুলতে সময় লাগবে কয়েকশ বছর।
১৫ র্যাম্প থেকে কমিয়ে ৯, চালু হয়নি একটিও: লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের নকশায় ১৫টি র্যাম্প ছিল। গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিডিএতে চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্যপদে পরিবর্তন আসে। এরপর যানজটের দোহাই দিয়ে ৬টি র্যাম্প নির্মাণ স্থগিত করা হয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৯টির মধ্যে একটির নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। ৪টির কাজ শেষ হলেও যান চলাচল শুরু হয়নি। বাকিগুলোর কাজ চলমান।
যানবাহন চালকরা বলছেন, অনেক জায়গা থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে গেলে ঘুরপথে যেতে হয়। আগ্রাবাদ, এ কে খান ও লালখান বাজার এলাকার অনেকেই মনে করেন, ‘ওঠার আগে এত ঘোরাঘুরি করতে হয় যে নিচ দিয়ে গেলেই সময় বাঁচে।’
কাজ শেষ হওয়ার আগেই উদ্বোধন: নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়। সে সময় প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এক্সপ্রেসওয়ে। এক বছর পরীক্ষামূলক চললেও গত ৩ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে টোল আদায় শুরু হয় এই উড়ালসড়কে। নাম পাল্টে করা হয় শহীদ ওয়াসিম আকরাম এক্সপ্রেসওয়ে। বর্তমানে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৯১ শতাংশ।
ছিনতাই-অপহরণের জন্য ‘নিরাপদ’ এক্সপ্রেসওয়ে: চট্টগ্রামের এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ছিনতাই ও অপহরণের জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও পর্যাপ্ত আলোকায়নের ব্যবস্থা না থাকায় রাতের বেলায় প্রায়ই এই উড়ালসড়কে ছিনতাইয়ের শিকার হতে হয়। যে কারণে রাত একটু গভীর হলেই চালকরা আর এই সড়ক ব্যবহার করেন না। চলতি বছরে গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে প্রবাসীসহ বেশ কয়েকজন যাত্রীকে জিম্মি করে লুটে নেওয়া হয়েছে তাদের স্বর্বস্ব। একাধিক ঘটনায় কোটি টাকার নগদ, স্বর্ণ ও ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
গতিসীমা মানছেন না চালকরা, প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা: এক্সপ্রেসওয়েতে নির্ধারিত গতিসীমা না মানায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। পরীক্ষামূলক চালুর পরপরই দুই মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হলেও সতর্ক হয়নি কেউ। চলতি নভেম্বরে দুটি প্রাইভেটকার উল্টে গেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নিমতলা এলাকায় একটি একটি গাড়ি মোটরসাইকেলের ওপর ছিটকে পড়ে। এতে একজনের মৃত্যু হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৌশলগত ত্রুটির বাঁকগুলোতে গতিরোধক আরও ঝুঁকি তৈরি করছে। গতির নিয়ন্ত্রণ না থাকা এবং চালকদের অসচেতনতাকে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির মূল কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া কালবেলাকে বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডিতে (সম্ভাব্যতা যাচাই) অতিরিক্ত বিষয় দেখানো হয়েছে। অতিরিক্ত না দেখালে ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। আর গ্রহণযোগ্য না হলে এ ধরনের প্রকল্পে সুফল আসবে না।’
তিনি বলেন, ‘ফরমায়েশি ফিজিবিলিটি স্টাডির কারণে এ অবস্থা। বর্তমানে যে পরিমাণ গাড়ি চলে, এটাই বাস্তবসম্মত। ওরা অতিরিক্ত গাড়ি চলবে দেখিয়েছে। সাধারণ মানুষ তো এসব বোঝে না। এখন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে কিছু মানুষ হয়তো উপকার পাচ্ছে। কিছু র্যাম্প নামানোর কথা, সেটাও করতে পারছে না। ফলে জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও সুফল মিলছে না, মিলবেও না। আগে জবাবদিহি ছিল না। এখন সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, ‘এটাকে আমরা নগর পরিকল্পনাবিদরা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েই বলি না। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে একটা শহরকে বাইপাস করে দেওয়ার জন্য একটা সড়ক। এগুলোতে খুব কমসংখ্যক ওঠানামার র্যাম্প থাকে। আমরা চটকদার করার জন্য বলেছিলাম, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। এটা সম্পূর্ণই একটি ফ্লাইওভার। এক্সপ্রেসওয়েতে সাধারণত সাত-আট কিলোমিটারের আগে কোনো র্যাম্প থাকে না।’
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এ ধরনের একটা ব্যয়বহুল প্রকল্প নেওয়ার জন্য আমাদের যে আগ্রহ ও আসক্তি থাকে, বাস্তবে তার পূর্বপ্রস্তুতি বা সম্ভাব্যতার জায়গায় আমরা দুর্বল। আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদদের তথ্য অনুসারে চট্টগ্রাম নগরীতে ৪ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে। এই সীমিত সংখ্যক মানুষের কথা চিন্তা করে যদি আমরা এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নিই, তা তাহলে তা কতটা যুক্তিসংগত, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই প্রশ্নের আলোকেই কিন্তু গাড়ি না চলার বিষয়টি সামনে আসে।’
জনগণকে এক্সপ্রেসওয়েমুখী করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে। যেহেতু টোল আছে, তাই বাধ্য করা যাবে না। পাশাপাশি রাতের বেলায় চুরি-ছিনতাইয়ের খবর শোনা যায়। কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও আলোকায়ন নিশ্চিত করতে হবে। গভীর রাতে বাইকার বা ব্যক্তিগত গাড়ি চালকরা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজগুলো করলে আশা করি মানুষ উদ্বুদ্ধ হবে।’
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এ প্রকল্পের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘প্রকল্পের এখন পর্যন্ত ৯১ শতাংশ কাজ শেষ। এখন গড়ে প্রতিদিন ১০ হাজারের মতো গাড়ি চলাচল করে। র্যাম্পগুলো চালু হলে প্রত্যাশিত গাড়ি চলাচল করবে। নিরাপত্তার জন্য আমরা ২-৩ মাসের মধ্যে ২০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা লাগাব। পুরো সেটআপটা আমরা সিএমপিকে দিয়ে দেব। এ ছাড়া আমরা স্পিড ক্যামেরাও বসাব।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ, মামলাসহ বিভিন্ন জটিলতায় র্যাম্পগুলোর কাজ শেষ করা যায়নি। আমরা আশা করছি র্যাম্পগুলো চালু হলে প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলেও গাড়ি ভালোই চলাচল করবে।’