

এক সপ্তাহে পরপর তিন দফা ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক না কাটতেই বৃহস্পতিবার ফের ভূপৃষ্ঠের ঝাঁকুনিতে কেঁপেছে বাংলাদেশ। সপ্তাহখানেক ধরেই দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে রাজধানীর মানুষ এখন ভূমিকম্পের প্যানিক থেকে বের হতে পারছেন না। এরই মধ্যে গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভূমিকম্প নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।
তবে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঝুঁকি বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে জনগণের অসচেতনতা, সরকারের পরিকল্পনাহীনতা এবং প্রস্তুতির অভাবে। ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও পূর্বপ্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বর্তমানে ঢাকার উত্তরাঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণাঞ্চল ভূমিকম্পের বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি ৫ দশমিক ৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়েছে, তাতে মানুষ আতঙ্কিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। কারণ এমন তীব্র ঝাঁকুনি অনেকে এর আগে কখনো অনুভব করেননি। এজন্য মানুষের আতঙ্কিত হওয়াটা স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের পর আফটারশক হয়, সে কারণে মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি বা পেজ থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছে, ৫ ডিসেম্বর নাকি একটি বড় ভূমিকম্প হবে, সামনে আরও বড় কিছু আসছে—এমন কথাবার্তা ছড়িয়ে মানুষের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছে। অনেককে দেখেছি ভয়ে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ রাতে ঘুমাতে পারছেন না। অনেক জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন বন্ধ ঘোষণা করা হলো, তখন দেশব্যাপী আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা কার সঙ্গে আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা আমার জানা নেই। তবে তাদের এটা করা উচিত হয়নি। এর ফলে সমাজে একটি বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আমরা যারা ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করি, আমাদের সঙ্গে অন্তত কথা বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যদি ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতনতা থাকত, তাহলে আমরা এতটা আতঙ্কিত হতাম না বা কারও প্যানিক অ্যাটাক হতো না। এমনকি সেদিন যে ১০ জন মারা গেছে, সেই রকম ঘটনাও ঘটত না—যদি তারা সচেতন থাকতেন। সেদিন তারা আতঙ্কিত হয়ে সঠিক জায়গায় অবস্থান না নিয়ে ভুল জায়গায় ছিলেন, এজন্যই মারা গেছেন। তাই আমাদের সবার ভূমিকম্প সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।’
সম্প্রতি নরসিংদীর মাধবদীতে হওয়া ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পরের দিন আবার একটি ভূমিকম্প হয়। সেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল রাজধানীর বাড্ডা বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানালেও, তা সরাসরি ‘ভুল ও অপপ্রচার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার। তিনি বলেন, ‘বাড্ডায় ভূমিকম্পের যে তথ্য আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ ভুল। ওটা নরসিংদীর ভূমিকম্পের আফটারশক।’
আবহাওয়া অফিসের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তর এখনো নিজেদের দক্ষতা-সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি। ভূমিকম্প যখন হয়, তখন কোথায় এবং কত মাত্রার হয়েছে, তা ওরা তাৎক্ষণিকভাবে বলতে পারে না।’ প্রশ্ন করলে বলে, ‘আমরা কাজ করছি। পরে যখন ইউএসজিএস, ভারতীয় বা ইউরোপীয় বা অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাইটে তথ্য আসে, তখন তারা সেটিই হুবহু তুলে দেয়।’
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বড় কোনো ভূমিকম্পের সম্ভাবনা আছে কি না—এমন প্রশ্নে ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘আমরা এ নিয়ে কাজ করেছি। ভূমিকম্পের উৎস কোথায়, সেটা আমরা নির্ধারণ করেছি। দুটি বড় উৎসের একটি মেঘালয়ের পাদদেশে, যেটা আট মাত্রায় হতে পারে। আরেকটি বড় উৎস আরও ভয়াবহ—সেটি হলো ‘সাবডাকশন জোন’। এটি সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত। সাবডাকশন জোনটি শুরু হয়েছে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হাওর অঞ্চল হয়ে মেঘনার পূর্বাংশ পর্যন্ত। এটি ১২ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে। তবে এসব ভূমিকম্পের প্রভাব অনেকটা ভারতের দিকে ঝুঁকে যাবে।’
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসতাক আহমেদ বলেন, ‘ঢাকা বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। এ ছাড়া রাজধানীতে গড়ে ওঠা ভবনগুলোর গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ঢাকার উত্তরাঞ্চলের মাটি তুলনামূলকভাবে ভালো, সেখানে ঝুঁকি কম। তবে দক্ষিণাঞ্চলে ভরাট করা জমিতে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যা এলাকাটিকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।’
একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘ভূমিকম্প কখন হবে—এটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। তবে আমরা যদি আতঙ্কিত না হয়ে কী করা উচিত, তা আগে থেকেই জেনে রাখি, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি কমবে।’
উন্নত বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘জাপান বা নিউজিল্যান্ডে ৫-৬ মাত্রার ভূমিকম্প নিয়মিত হয়। তারা এ নিয়ে আতঙ্কিত হয় না, কারণ তাদের বাড়িঘর সেভাবেই নির্মিত। এ ছাড়া সেখানকার মানুষ ভূমিকম্প সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তারা জানে ভূমিকম্পের সময় কী করতে হয়। আমাদেরও উচিত, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া।’
অধ্যাপক বদরুদ্দোজা মিয়া আরও বলেন, ‘ভূমিকম্প বিষয়টি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কখন হবে তা বলা সম্ভব নয়। তবে ক্যালকুলেশন বলছে, বাংলাদেশের সিলেট সীমান্তঘেঁষা এলাকায় একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। এর মাত্রা আট বা তার বেশি হতে পারে।’
মন্তব্য করুন