

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিশেষ করে ভোটগ্রহণের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সীমান্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ ভোটের মাঠে বড় শঙ্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র কারবারিদের সক্রিয় হয়ে ওঠার তথ্য মিলেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর অরক্ষিত সীমান্তপথে বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান। এই দুই সীমান্তের অনেক চোরাকারবারিই এখন অন্যান্য পণ্য বাদ রেখে ব্যস্ত অবৈধ অস্ত্রের চালান দেশে ঢোকাতে, যা ঠেকাতে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব নজরদারির পাশাপাশি জোরদার করেছে অভিযান, তবুও স্থল সীমান্তপথে প্রায় প্রতিদিনই ঢুকছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের চালান।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে অন্তত ৪০ কিলোমিটার এলাকায় নেই কাঁটাতারের বেড়া। এই অরক্ষিত অংশই হয়ে উঠেছে অস্ত্র পাচারের প্রধান পথ। এই সীমান্ত পাহারায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তিনটি ব্যাটালিয়ন মোতায়েন থাকলেও নিত্যনতুন কৌশলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে কারবারিরা। বিজিবির হাতে যেসব অস্ত্র ধরা পড়ছে, তার বড় অংশই নাইন এমএম পিস্তল। রাজশাহীর গোদাগাড়ী, পবা, বাঘা ও চারঘাট সীমান্ত দিয়ে ঢুকে এসব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। নির্বাচন সামনে রেখে এসব অস্ত্র ভোটকালীন সহিংসতায় ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবৈধ অস্ত্রের এমন ছড়াছড়িতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. জামাত খান কালবেলাকে বলেন, ‘সীমান্তপথে অবৈধ অস্ত্র আনা হচ্ছে এবং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। এগুলো ভোটের সময় ব্যবহার হতে পারে। ভোটার হিসেবে আমি আতঙ্কিত। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভোট দিতে যাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’
ভোটের মাঠে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদরাও। রাজশাহী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু বলেন ‘অবৈধ অস্ত্রধারীরা যে দলেরই হোক, তারা জাতির শত্রু। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’
নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্তবর্তী ২৭ জেলায় অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত ৭৮৭ জনের (লাইনম্যান নামে পরিচিত) তালিকা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩৮ জন, রাজশাহীর তিনজন, জয়পুরহাটে ১৬ জন এবং নওগাঁর রয়েছে ১৯ জন। বাকিরা অন্যান্য জেলার। তালিকাভুক্ত এসব লাইনম্যানের ওপর বিশেষ নজরদারি চলছে। পাশাপাশি নতুন অস্ত্র কারবারিদের শনাক্তে তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করছে বিজিবি।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অস্ত্র ঢোকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে। শিবগঞ্জ উপজেলার রানীনগর হঠাৎপাড়া, শাহাপাড়া, পণ্ডিতপাড়া, বালিয়াদিঘিসহ কয়েকটি গ্রামের বেশ কয়েকজন সীমান্তপথে অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের চালান যে একেবারেই ধরা পড়ছে না, তা নয়। গত বছরের ২৬ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে যাওয়া বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে অভিযান চালিয়ে আটটি বিদেশি পিস্তল, ১৪টি ম্যাগাজিন, ২৬টি গুলি, গানপাউডার ও প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। সীমান্ত থেকেই এসব অস্ত্র ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল।
এর আগে, গত ১৬ আগস্ট রাজশাহী নগরের কাদিরগঞ্জ এলাকার একটি কোচিং সেন্টারে অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি এয়ারগান, একটি রিভলবার ও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারিতেও একের পর এক অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। ৫ ডিসেম্বর বাঘার জোত কাদিরপুর এলাকায় দুটি ওয়ান শুটারগান ও হেরোইন উদ্ধার করে র্যাব। ১২ জানুয়ারি রাজশাহী নগরের সিটিহাট এলাকায় জেলা আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত কার্যালয়ের পাশ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি গুলি ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। তানোর, কাটাখালীসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকাতেও র্যাব ও বিজিবির অভিযানে মিলেছে পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই জব্দ হয়েছে ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪১টি গুলি ও সাড়ে ৯ কেজি বিস্ফোরক। জানুয়ারির শুরুতে শিবগঞ্জের আজমতপুর সীমান্তে আমবাগান থেকে উদ্ধার করা হয় দুটি ওয়ান শুটারগান। এর আগেও একাধিক দফায় পিস্তল ও গুলি জব্দ হয়েছে।
দেশে সংসদ বা ইউপি যে কোনো নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই কদর বেড়ে যায় অবৈধ অস্ত্রধারীদের। নির্দিষ্ট প্রার্থীকে জয়ী করতে প্রকাশ্যে-গোপনে নানাভাবে সক্রিয় হয় ভাড়াটে এসব সন্ত্রাসী। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অপহরণ, কেন্দ্র দখল, গোলাগুলি বা অস্ত্রের মহড়ার মতো কর্মকাণ্ডে বাড়ে বহিরাগতদের আনাগোনা। রক্ষক্ষয়ী সংঘাতে কখনো কখনো পড়ে লাশও।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান কালবেলাকে বলেন, ‘অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় বিশেষভাবে কাজ করছি। ইতিমধ্যে বেশ কিছু বড় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সীমান্ত অপরাধ কমেছে, ভোটের পরিবেশও স্বাভাবিক।’
সীমান্ত পথে অবৈধ অস্ত্র ঢোকা ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর তথ্য জানান বিজিবির রাজশাহী-১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘পদ্মা নদীতে সাতটি স্পিডবোট দিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে। ভোট উপলক্ষে সাত শতাধিক বিজিবি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।’
মন্তব্য করুন