

যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের যৌন নিপীড়ক ও নারী পাচারকারী জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। যা উন্মোচন করার পর বিশ্বজুড়ে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। গত শুক্রবার বিচার বিভাগের প্রকাশ করা ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালে যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও এপস্টেইনের সঙ্গে বহু হলিউড তারকা, রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। নথিতে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন ইলন মাস্ক, প্রিন্স অ্যান্ড্রু, বিল ক্লিনটন, রিচার্ড ব্র্যানসন, হাওয়ার্ড লুটনিকসহ আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এ ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী রাজনীতিক, রাজপুত্র, রাজকন্যার নামও রয়েছে এ কেলেঙ্গারিতে।
ইলন মাস্ক: নথিতে দেখা যায়, ইলন মাস্ক ও এপস্টেইনের মধ্যে কয়েক দফা ই-মেইল আদান-প্রদান হয়েছিল। এক ই-মেইলে মাস্ক এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে জানতে চান, ‘দ্বীপে সবচেয়ে উদ্দাম পার্টি কবে হবে?’
তবে মাস্ক দাবি করেছেন, তিনি কখনোই এপস্টেইনের দ্বীপে যাননি বা তার ব্যক্তিগত বিমানে চড়েননি। তার মতে, কিছু ই-মেইল ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ক্যাথি রুমলার: বারাক ওবামা প্রশাসনের হোয়াইট হাউসের আইন উপদেষ্টা ক্যাথি রুমলারের নামও রয়েছে এ নথিতে। ই-মেইলে দেখা যায়, তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং উপহার গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা ছিল। তবে তার মুখপাত্র জানিয়েছেন, এসব উপহার ছিল পেশাগত সম্পর্কের অংশ এবং ‘দ্য গার্লস’ শব্দটি কোনো বেআইনি অর্থে ব্যবহৃত হয়নি।
হাওয়ার্ড লুটনি: বর্তমান মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক দাবি করেন, এপস্টেইনকে তিনি ‘ঘৃণ্য মানুষ’ মনে করতেন। কিন্তু নথিতে দেখা যায়, ২০১২ সালে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এপস্টেইনের দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে ই-মেইল করেছিলেন।
রিচার্ড ব্র্যানসন: ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসনের সঙ্গে এপস্টেইনের বন্ধুত্বপূর্ণ ই-মেইলের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এক ই-মেইলে তিনি মজা করে ‘হারেম’ শব্দ ব্যবহার করেন। ব্র্যানসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই বৈঠক ছিল পুরোপুরি ব্যবসায়িক এবং সেখানে কোনো অবৈধ কিছু ঘটেনি।
স্টিভেন টিশ: নিউইয়র্ক জায়ান্টস দলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভেন টিশের নাম নথিতে ৪০০ বারের বেশি উল্লেখ আছে। ই-মেইলে এপস্টেইন বিভিন্ন নারীর সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিতেন। টিশ স্বীকার করেছেন, তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ
রেখেছিলেন, তবে এখন সেই সম্পর্কের জন্য অনুতপ্ত।
প্রিন্স অ্যান্ড্রু: যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নাম বহুবার নথিতে এসেছে। এপস্টেইনকে তিনি বাকিংহাম প্যালেসে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এপস্টেইনের ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে দাবি করেছিলেন, ১৭ বছর বয়সে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে তার জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক হয়েছিল— যা অ্যান্ড্রু বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।
বিল ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
নথিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের এপস্টেইনের বিমানে ভ্রমণের তথ্য রয়েছে এবং হোয়াইট হাউসে সাক্ষাতের কথাও পাওয়া গেছে। ক্লিনটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০০৬ সালে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর তিনি সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এ ছাড়া বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামও হাজারো বার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
লর্ড ম্যান্ডেলসন: এপস্টেইনকাণ্ডে বিতর্কের মুখে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টি সদস্যপদ ছেড়েছেন লর্ড পিটার বেঞ্জামিন ম্যান্ডেলসন। দেশটির সাবেক এ মন্ত্রী বলেছেন, এপস্টেইনের সঙ্গে তার অতীত সম্পর্ক নিয়ে যাতে আর কোনো ‘বিব্রতকর পরিস্থিতি’ সৃষ্টি না হয়, সে জন্যই দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত তার। এপস্টেইন নথিতে লিবিয়ার সম্পদ নিয়ে কথা উঠেছে। এ ছাড়া এপস্টেইনের অন্ধকার জগতের আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ প্রকাশিত এক গুচ্ছ নথি থেকে জানা গেছে, লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও আন্তর্জাতিক বাজারে জমে থাকা বিশাল পরিমাণ অবরুদ্ধ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক বিশাল পরিকল্পনা করেছিলেন এপস্টেইনের এক সহযোগী। এ কাজে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা (এমআই৬) এবং ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তাদের সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।
২০১১ সালের জুলাইয়ে এপস্টেইনকে পাঠানো একটি ই-মেইলে এই বিশদ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সেই সময় লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিরোধী গণঅভ্যুত্থান চরম পর্যায়ে ছিল। ই-মেইলটিতে দাবি করা হয়, আন্তর্জাতিক স্তরে লিবিয়ার প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবরুদ্ধ হয়ে আছে, যার মধ্যে শুধু আমেরিকাতেই রয়েছে ৩২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এপস্টেইনের সহযোগী অনুমান করেছিলেন, প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ এর চেয়ে তিন-চারগুণ বেশি হতে পারে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যদি আমরা এ অর্থের ৫ থেকে ১০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করতে পারি এবং তার বিনিময়ে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ কমিশন পাই, তাহলে আমরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মালিক হতে পারব।’
এই ই-মেইলের সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশটি হলো গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ব্যবহারের প্রস্তাব। ই-মেইল প্রেরক দাবি করেন, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই ৬ এবং ইসরায়েলি সংস্থা মোসাদের বেশ কিছু সাবেক কর্মকর্তা এই ‘চুরি হওয়া সম্পদ’ শনাক্ত ও উদ্ধারে সহায়তা করতে ইচ্ছুক। শুধু তাই নয়, লিবিয়া পুনর্গঠনের জন্য পরবর্তী বছরগুলোয় যে ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হওয়ার কথা ছিল, সেই খাতেও নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের নীলনকশা তৈরি করা হয়েছিল।