আমেনা হীরা
প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা বিষয়ে কথা রাখতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার

হয়নি প্রত্যাবাসন
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। ছবি : সংগৃহীত
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। ছবি : সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষ হতে চলেছে, কিন্তু দেশের সবচেয়ে জটিল সংকট রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতেই রোহিঙ্গা সমস্যাকে প্রাধান্য দিয়ে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ড. খলিলুর রহমানকে।

ফলে অনেকেই বিগত সরকারের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বেশি আস্থা রেখেছিল। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কয়েকবার বলেছিলেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই রোহিঙ্গারা ঘরে ফিরবে। কিন্তু ডিসেম্বর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং রাখাইন সীমান্তে নতুন উত্তেজনা এবং রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা বেড়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কূটনীতিক কালবেলাকে বলেন, ‘জান্তা সরকার কখনোই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা রাখেনি। মিয়ানমারে সাম্প্রতিক নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা জান্তা সমর্থিত। ফলে নতুন সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগ্রহ দেখাবে না। তবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকারের একটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা ছিল। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফলপ্রসূ অগ্রগতি না হওয়ায় ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হবে।’

রোহিঙ্গা সংকটের শিকড় বহু পুরোনো। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের আগস্টে সেনাবাহিনীর অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয় এবং প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ এ ঘটনাকে জাতিগত নিধন হিসেবে উল্লেখ করে। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার শিবিরে অবস্থান করছে। তাদের ভরণপোষণে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সাহায্যকারী সংস্থাগুলোর বাজেট সংকোচনের ফলে খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা কমেছে, যা বাংলাদেশ ও শরণার্থীদের জন্য বড় উদ্বেগ।

গত বছর থাইল্যান্ডে বিমসটেক সম্মেলনে বিশেষ দূত জানান, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে এবং ডিসেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু হবে।’ কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। আগস্টে কক্সবাজারে স্টেকহোল্ডার ডায়ালগে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জানালেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র কালবেলাকে জানায়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রত্যাবাসন সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চাপের অভাবও এ ব্যর্থতার কারণ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত কার্যকর ভূমিকা নেয়নি। চীন জান্তার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যের কারণে প্রত্যাবাসনে জোর দেয়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএআইডির সহায়তা কমিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাজেট সংকোচন করেছে। সরকারের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, পশ্চিমারা চায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাক। তারা কাজ করে আয় করলে বিদেশি অনুদানের প্রয়োজন কমবে। এতে পশ্চিমাদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার চাপ কমবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। তাদের বাংলাদেশের নাগরিক বানানো উচিত হবে না। এতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে।

প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি না থাকলেও সীমান্তে অনুপ্রবেশ বেড়েছে। ২৬ জানুয়ারি টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে রোহিঙ্গা প্রবেশের খবর পাওয়া যায়। শিবিরে অস্ত্র চোরাচালান ও সশস্ত্র গ্রুপের তৎপরতা বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফরটিফাই রাইটস জানায়, কিছু গ্রুপ শরণার্থীদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে। অনেকে ক্যাম্প ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। বিজিবি পাহারা জোরদার করলেও দীর্ঘ সীমান্ত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

২৬ জানুয়ারি টেকনাফে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপের সংঘর্ষে গোলাগুলির ঘটনায় এক বাংলাদেশি শিশু নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। আরাকান আর্মি রাখাইনের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়ছে এবং এআরএসএ ও আরএসওকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ করেছে। উত্তেজনার ফলে সীমান্তে ড্রোন নজরদারি ও অস্ত্র চোরাচালান বেড়েছে। বাংলাদেশ সরকার প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং মিয়ানমারকে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেছে। তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালবেলাকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন। কার্যকর সমাধান সরকারকেই খুঁজতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জান্তা কখনোই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চায়নি। সেনা সমর্থিত সরকার এ বিষয়ে অগ্রসর হবে, তা ভাবা অতিরঞ্জিত। সামনে আরও অনুপ্রবেশ হলে নিরাপত্তা সংকট বাড়বে।’

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করেছে। ২৯ জানুয়ারি মৌখিক শুনানি শেষ হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, রায় ডিসেম্বর মাসে আসতে পারে। রায় মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে পারে, তবে জান্তা তা মানবে কি না অনিশ্চিত।

আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার না হলে রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বোঝায় পরিণত হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দাওয়াত খেয়ে ফেরার পথে আ.লীগ নেতাকে নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ

আজকের নামাজের সময়সূচি

গভীর রাতে হঠাৎ ক্ষুধা লাগলে কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন?

ডিজিটাল গণমাধ্যম অগ্রদূতের আত্মপ্রকাশ

মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদল নেতাদের ওপর ‘আ.লীগের’ হামলা, আহত ১৮

রাজনীতিতেই থাকতে চাই, চাকরি নয় : ছাত্রদল নেতার আবেগঘন স্ট্যাটাস

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশ / জিম্মায় নেওয়া চুরির মালামাল থানায় ফেরত দিলেন কর্মকর্তা

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকারদলীয় এমপিদের সভা অনুষ্ঠিত

সকাল ৯টার মধ্যে ১৮ জেলায় ঝড়ের আভাস

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের চালকসহ গ্রেপ্তার ৩ জনের জামিন

১০

৩৫.৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড / সিলেটে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন

১১

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নাহিদ ইসলামের বৈঠক

১২

মধ্যরাতে দেশে পৌঁছাবে লেবাননে নিহত ২ বাংলাদেশির মরদেহ

১৩

শেষ মুহূর্তে বড় ধাক্কা, আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের বিশ্বকাপ শেষ

১৪

বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩ অটোরিকশা যাত্রীর

১৫

রোগীকে আটকে ইনজেকশন পুশের টাকা দাবি, নার্সকে শোকজ  

১৬

গৃহকর্মী থেকে মন্ত্রী : কলিতা মাঝির উত্থানের গল্প

১৭

নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করল চসিক

১৮

এসএসসি পরীক্ষার্থীকে বলাৎকার, আ.লীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ২

১৯

তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

২০
X