

মানিকগঞ্জের তিনটি আসনেই ধানের শীষের প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। ১৯৭৫ সালের পর থেকে জেলার প্রতিটি আসনে জয়লাভ করেছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। তবে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের কাছে সব আসন হারায় বিএনপি। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি হারানো আসনগুলো ফিরে পেয়েছে। মানিকগঞ্জের তিনটি আসনে প্রায় ৬৩ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়। তার মধ্যে বিএনপির তিন প্রার্থী বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন।
জেলার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ধানের শীষের প্রার্থীদের বেছে নিয়েছেন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং সৎ নেতাদের প্রার্থী দেওয়ায়। এ ছাড়া তাদের ভাষ্য, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমান ও দলটির আদর্শের প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ দেশি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাদের নীতি ভোটারদের আকৃষ্ট করে।
শিবালয়, ঘিওর, দৌলতপুর এই তিন উপজেলা মিলে মানিকগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন এস এ জিন্নাহ কবির, যাকে এ আসনের লোকজন চেনেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে। গত ১৫ বছরে জেলজুলুম ও নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখায় তৃণমূল বিএনপি ও সাধারণ মানুষদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। এ ছাড়া এখানকার মানুষ পদ্মা ও যমুনা নদীর ভাঙনে দিশেহারা। ভোটারদের বিশ্বাস— জিন্নাহ কবির নদীভাঙনসহ এ আসনে শিল্প, কলকারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য বড় ভূমিকা রাখবেন। যাতে বেকারত্ব দূর হবে। এ ছাড়া যুবকদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ভালো ছিল। সর্বোপরি এসব কারণেই তার বিজয় নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করেন ভোটাররা।
রিটার্নিং অফিসারের সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী ছিলেন সাতজন। আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৪২। নির্বাচনে কেন্দ্র ছিল ১৮০টি। ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার ৭০৪। ধানের শীষের প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবির ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়ে বিজয় হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র (ঘোড়া মার্কা) প্রার্থী মো. তোজাম্মেল হক পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৮১৮ ভোট। এ ছাড়া জামায়াত প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক পেয়েছেন ৭১ হাজার ৩১০ ভোট। এ ছাড়া এ আসনে জামানত হারিয়েছেন চারজন। তারা হলেন, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) মোহাম্মদ ইলিয়াছ হুছাইন, জনতার দলের মোহাম্মদ শাজাহান খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুল আলী বেপারি ও ইসলামী আন্দোলনের বাংলাদেশের মো. খোরশেদ আলম।
সিংগাইর ও হরিরামপুর উপজেলা মিলে মানিকগঞ্জ-২ আসনের ধানের র্শীষের প্রার্থী ছিলেন মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। এ আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানকার মানুষ পদ্মার ভাঙনে দিশেহারা। ফসলি জমিসহ বসত বাড়ির কয়েক হাজার বিঘা জমি পদ্মায় বিলীন হয়েছে শত শত পরিবারের। তারা বিশ্বাস করেন, শান্ত সংসদ সদস্য হয়ে এ ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা নেবেন। তারা আরও বলেন, মঈনুল ইসলাম খান শান্ত একজন ভালো মনের মানুষ। তিনি মানুষের সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে থাকেন। তার বাবাও ছিলেন তৎকালীন বিএপির বাণিজ্যমন্ত্রী সামসুল ইসলাম খান। সিংগাইর, হরিরামপুরের মানুষের জন্য অনেক কিছু করেছেন তিনি। মানুষের আস্থা রয়েছে এই পরিবারে প্রতি। ভোটাররা আশা করছেন, বাবার মতোই শান্ত তাদের জন্য কিছু করবেন। এ ছাড়া দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমানের আদর্শের প্রতি আস্থা রয়েছে ভোটারদের।
মানিকগঞ্জ-২ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রার্থী ছিলেন চারজন। এ আসনে মোট ভোট সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৯৭। নির্বাচন ভোটকেন্দ্র ছিল ১৮৬টি। ভোট পড়েছে ২ লাখ ৭৩ হাজার ১৪৭। বিএনপির প্রার্থী মঈনুল ইসলাম খান ১ লাখ ৭৫ হাজার ৭৭৬ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মো. সালাহ উদ্দিন পেয়েছেন ৮১ হাজার ৫৩১টি ভোট। এ ছাড়া জামানাত হারিয়েছেন দুজন। তারা হলেন, জাতীয় পার্টির এস এম আব্দুল মান্নান ও বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ আলী।
মানিকগঞ্জের-৩ (সদর ও সাটুরিয়া) আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন ধানের শীষের আফরোজা খানম রিতা। বর্তমানে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী। বিএনপির প্রয়াত মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খানম রিতার মানিকগঞ্জ জেলা জুড়েই জনপ্রিয়তা রয়েছে। আওয়ামী-লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরের দুংসময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের নিজের আঁচলের নিচে ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন রিতা। তার কারখানার জমি বিক্রয় করে নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন তিনি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিটিং মিছিলে অংশ নিতেন। এ ছাড়া ঢাকায় যখন কেন্দ্রীয় নেতারা প্রোগ্রাম করতে পারতেন না, সে সময় রিতা কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে নিজ এলাকা অনুষ্ঠান করতেন। বাবার মতোই রিতা দানবীর, অন্যায়ের সঙ্গে আপসহীন, সহসী নেত্রী বলে জানান ভোটাররা।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন ৯ জন। এ আসনে মোট ভোট ছিল ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৯১৮। নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রে ছিল ১৫১টি। ভোট পড়েছিল ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৬৫টি। এ আসনে বিএনপির আফরোজা খানম রিতা ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে বিজয় হয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ সাঈদনুর পেয়েছেন ৬৪ হাজার ২৪২ ভোট। এ ছাড়া এ আসনে জামানত হারাচ্ছেন সাত প্রার্থী। তারা হলেন, জাতীয় পাটির আবুল বাশার বাদশা, স্বতন্ত্র প্রার্থী মফিজুল ইসলাম খান কামাল, জাতীয় পার্টির (জেপি) মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, বিএনপির বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আতাউর রহমান আতা, জাসদের মো. শাহজাহান আলী, স্বতন্ত্র প্রার্থী রফিকুল ইসলাম খান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সামসুদ্দিন পেয়েছেন ২৭৮৭ ভোট।