কুয়াকাটায় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের জমি দখল করে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র মো. আনোয়ার হাওলাদারের বিরুদ্ধে। এর প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে বৌদ্ধ বিহার কর্তৃপক্ষ। গত রোববার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। এদিকে বৌদ্ধ বিহারে টয়লেট নির্মাণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে দায়ীদের বিচার দাবি জানিয়েছেন দেশের ৪৪ বিশিষ্ট নাগরিক।
কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বিহারাধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ ভান্তে স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে বলা হয়, কুয়াকাটার কেরানীপাড়া সংলগ্ন এস এ ৫৩০নং খতিয়ানের ৫৩৭৪নং দাগে ২ দশমিক ৪৪ একর জমি ১৯৪৭ সালের ৭ নভেম্বর রেজিস্ট্রিকৃত ০৯নং চুক্তিপত্র দলিলের মাধ্যমে বৌদ্ধ বিহার নির্মাণের জন্য কেরানীপাড়ার মগগনের পক্ষে পাড়া মাদবর নোলাউ মগ বরাবর হস্তান্তর করে। মূলত দলিল মূল্যে শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার কর্তৃপক্ষ ওই জমির মালিক।
কিন্তু এস এ ৫৩৭৪নং দাগের পূর্ব অংশে রাখাইন মার্কেট সংলগ্ন জমিতে কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজ শুরু করেন। শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার কর্তৃপক্ষ ওই কাজ বন্ধে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ দেখিয়ে নির্মাণকাজে আপত্তি জানায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, গত ২৪ শনিবার রাতে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে পাবলিক টয়লেটের ছাদ ঢালাই কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে পৌর কর্তৃপক্ষ। পৌরসভা এলাকায় অঢেল জমি থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমি দখল করে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের বিষয়টিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন।
জানতে চাইলে বিহারে অধ্যয়নরত ছাত্র উচাচি বলেন, আমরা এর প্রতিকার চাই। রাখাইন নারী নেত্রী লুমা রাখাইন বলেন, আমরা এর প্রতিকার চাই। সুষ্ঠু সমাধান চাই। আমাদের জমিতে কোনো স্থাপনা করতে দেব না।
এ বিষয়ে কুয়াকাটা পৌর মেয়র মো. আনোয়ার হাওলাদার কালবেলাকে বলেন, এটা আমার ব্যক্তিগত কাজ নয়। এটা পর্যটকদের জরুরি কাজ সারার জন্য। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও জানেন। কয়েকদিন আগে সিপিপির একটি প্রোগ্রাম হয়েছিল কুয়াকাটায়। তখন টয়লেট এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল যে, তাৎক্ষণিক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক নুর কুতুবুল আলম কালবেলাকে বলেন, শনিবার রাতে মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে উভয় পক্ষকে কাগজপত্র নিয়ে বসতে বলা হয়েছে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে কোথায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
বিচার দাবি ৪৪ বিশিষ্টজনের: কুয়াকাটা বৌদ্ধ বিহারের জমিতে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ৪৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। গত মঙ্গলবার এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের জমিতে পাবলিক টয়লেট নির্মাণকাজের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত করে বৌদ্ধ বিহারের জমির পরিবর্তে অন্য স্থানে পাবলিক টয়লেট স্থানান্তর করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এমন অসাংবিধানিক নিপীড়নমূলক ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব সম্পন্ন কাজ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বৌদ্ধ বিহারের মতো পবিত্র স্থানে পাবলিক টয়লেট স্থাপন কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। এ কাজটি ধর্মীয় উসকানি বা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ধর্মের অবমাননার শামিল। পৌরসভা এলাকায় অনেক জমি থাকা সত্ত্বেও বৌদ্ধ বিহারের মতো পবিত্র স্থানে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এটা সংখ্যালঘু রাখাইন সম্প্রদায়কে তাদের উচ্ছেদের চেষ্টার সুস্পষ্ট নামান্তর। কেন বৌদ্ধ বিহারের দেয়াল ভেঙে এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের চেষ্টা করা হলো তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তির দাবি জানায়।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের মধ্যে রয়েছেনÑ সুলতানা কামাল, খুশী কবির, অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, রাশেদা কে চৌধুরী, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ড. পারভীন হাসান, শিরিন হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রমুখ।