কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৫, ০৮:৩৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্কুলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন দরকার

ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী
শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্কুলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর বাস্তবায়ন দরকার

প্রায়ই দেখা যায়, স্কুল প্রাঙ্গণে ধূমপানের ধোঁয়া নতুন প্রজন্মকে গ্রাস করছে। কিশোর-কিশোরীরা নীরবে তামাক আসক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। গ্লোবাল ইয়ুথ টোব্যাকো সার্ভে (২০১৩) অনুযায়ী, দেশের স্কুলগামী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে তামাক ব্যবহার একটি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলেদের ৯.২ শতাংশ এবং মেয়েদের ২.৮ শতাংশ ধূমপান করে, আর একই বয়সের ছেলেদের ৬.২ শতাংশ ও মেয়েদের ২.৯ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে। এ ছাড়া একই বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ পাবলিক স্থানে এবং ৩১.১ শতাংশ বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়। অন্য একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার আশপাশের স্কুলে পড়া শিশুদের মুখের লালায় উচ্চমাত্রায় নিকোটিন পাওয়া গেছে (কামরান এট. এল, ২০২৪)—যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এখন সময় এসেছে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে তামাক ব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার।

বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কিশোরদের মধ্যে তামাক ব্যবহার বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে ই-সিগারেট ও অন্যান্য নতুন ধরনের তামাক পণ্যের আগ্রাসন এ সংকটকে আরও জটিল করেছে। আকর্ষণীয় গন্ধ, রং ও ডিজাইনের মাধ্যমে এসব পণ্য কিশোরদের সহজেই আকৃষ্ট করছে। এগুলো কেবল সাময়িক আনন্দ দেয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক সুস্থতা, মনোযোগ ও শিক্ষাজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক (অক্টোবর ২০২৫) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৫০ লাখ কিশোর বর্তমানে ই-সিগারেট ব্যবহার করছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, কিশোররা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় গড়ে ৯ গুণ বেশি ই-সিগারেট ব্যবহার করছে। এটি মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়, কারণ তামাক কোম্পানিগুলো শিশু ও তরুণদের লক্ষ্য করে ডিজিটাল মাধ্যমে আগ্রাসী বিপণন চালাচ্ছে।

স্কুলে তামাক ব্যবহারের অন্যতম প্রধান কারণ হলো সহজলভ্যতা। গ্লোবাল ইয়ুথ টোব্যাকো সার্ভে ২০১৩ অনুযায়ী, ধূমপায়ী কিশোরদের প্রায় অর্ধেকই দোকান থেকে সহজেই তামাক পণ্য কিনতে পারে, যদিও তাদের বয়সে বিক্রয় আইনত নিষিদ্ধ। এ ছাড়া প্রায় ৭০ শতাংশ কিশোর কোনো না কোনোভাবে তামাকের বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার মুখোমুখি হয়, যা তাদের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ধূমপায়ী কিশোরদের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশ ধূমপান ছাড়তে চায়, কিন্তু তারা পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না। এসব তথ্য ইঙ্গিত করে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকাকে তামাকমুক্ত না করলে নতুন প্রজন্মকে আসক্তি থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

তামাক ব্যবহারের প্রভাব বহুমাত্রিক। স্বাস্থ্যগতভাবে এটি ফুসফুস ও শ্বাসনালির রোগ, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি, শিক্ষার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গভীর—ঘুমের মান নষ্ট হয়, মনোযোগ কমে এবং শিক্ষার অগ্রগতি ব্যাহত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এ সমস্যা সমাজ ও অর্থনীতিতেও আঘাত হানে। শিশুদের অসুস্থতা ও চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায়, ভবিষ্যতের উৎপাদনশীলতা কমে যায়, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর।

এ বাস্তবতায় এখনই প্রয়োজন কার্যকর নীতি ও কঠোর প্রয়োগ। প্রথমত, স্কুল প্রাঙ্গণ ও তার আশপাশে ১০০ গজের মধ্যে তামাক বিক্রি ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কিশোরদের জন্য নিয়মিত সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি চালানো জরুরি—যেমন অ্যাসেমব্লিতে তামাকের ক্ষতি নিয়ে আলোচনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণ, এবং ধূমপানবিরোধী ক্লাব গঠন। তৃতীয়ত, শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ধূমপান না করা, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের কাছে ইতিবাচক রোল মডেল হন। চতুর্থত, পরিবার, অভিভাবক ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে যুক্ত করতে হবে—কারণ, শিশুদের আচরণে পারিবারিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া, সরকারকে তামাক বিক্রি, বিজ্ঞাপন ও প্রমোশন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হতে হবে এবং কিশোরদের জন্য ন্যূনতম ক্রয়যোগ্য বয়স কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সিভিল সোসাইটির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।

তামাকমুক্ত স্কুল কেবল একটি নীতি নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার অঙ্গীকার। আজই পদক্ষেপ নিলে আমরা শুধু শিশুদের আসক্তি থেকে রক্ষা করব না, বরং একটি স্বাস্থ্যবান, সচেতন ও নিকোটিনমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব।

ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রামিসা হত্যা মামলার রায়কে স্বাগত জানাল জনতা

নদীর চরে পড়ে ছিল জেলের মরদেহ 

সিলেট সীমান্তজুড়ে বিজিবির টহল জোরদার

রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ সেই শিশুর বাবার, দ্রুত কার্যকরের দাবি

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা নিহত

মধ্যস্থতার বার্তা নিয়ে তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নতুন বাজেটে পে-স্কেল নিয়ে বড় ধামাকা

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা / বড় অঙ্কের জরিমানাও দিতে হবে সোহেল-স্বপ্নাকে

 বাহরাইন-কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান

ঈদযাত্রায় প্রাণ হারালেন ৪৩৮ জন

১০

নতুন উড়োজাহাজ কিনছে আমিরাতের ইতিহাদ এয়ারওয়েজ

১১

চট্টগ্রামজুড়ে ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা

১২

গাজায় শৌচাগার সংকটে মানবেতর জীবন, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

১৩

চমেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু

১৪

‘শুধু ফাঁসির আদেশ দিলেই হবে না, কার্যকরও করতে হবে’

১৫

পল্লবীর সেই ধর্ষণ ও হত্যা মামলা : আদালতে যা প্রমাণিত হলো

১৬

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা / রায়ের পর কাঁদছেন স্বপ্না, নির্বাক সোহেল

১৭

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা / আসামি সোহেল-স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

১৮

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় পড়া চলছে

১৯

পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা / আদালত প্রাঙ্গণে যেসব দাবি জানাচ্ছেন রায় শুনতে আসা মানুষ

২০
X